শত শত বছরের ঐতিহ্য বহন করে আসছে কুমিল্লার নমশূদ্র পল্লির বাঁশ ও বেতশিল্প। সুনিপুণ হাতে তৈরি কুলা, ঝুঁড়ি, খাঁচা, ডালা, মাছ ধরার ফাঁদসহ নানা পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি হয়। তবে সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প।
চট্টগ্রামে একদিনে পাঁচজনের করোনা শনাক্ত, মোট আক্রান্ত ১৬৩
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার আড়াইওরা গ্রামের গোমতী নদীর তীরঘেঁষা নমশূদ্র পল্লীতে পাঁচ শতাধিক পরিবারের বসবাস। বংশপরম্পরায় বাঁশ ও বেতশিল্পে জড়িত এ মানুষগুলো আজ কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। চড়া সুদের ঋণ, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ না পাওয়া, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও চাহিদা হ্রাস—সব মিলিয়ে টিকে থাকাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পল্লীর অন্তত এক হাজার মানুষ এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত, যার মধ্যে ছয় শতাধিক নারী। প্রতিমাসে তারা আয় করেন সংসার চালানোর মতো সামান্য অর্থ। সন্তানদের পড়াশোনা, ঋণ পরিশোধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের।
লালমাই পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা বাঁশ মানভেদে ১২০ থেকে ২৫০ টাকা দরে কেনা হয়। এরপর সেগুলো পানিতে ভিজিয়ে, রোদে শুকিয়ে এবং বেতি তুলে তৈরি হয় নানা ধরনের পণ্য। এগুলোর গড় বাজারমূল্য ১২০ থেকে ১৫০ টাকা হলেও পরিবহণ খরচ ও কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধির ফলে লাভের পরিমাণ দিন দিন কমছে।
কারিগরদের অভিযোগ, প্লাস্টিক সামগ্রীর সহজলভ্যতা এবং আধুনিক বাজার ব্যবস্থার সাথে তাল না মেলাতে পারায় বাঁশ ও বেতপণ্যের চাহিদা কমে গেছে। ফলে অনেকেই পেশা বদলে নিচ্ছেন, কেউ কেউ পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশেও।
এ পল্লীর বাসিন্দা নিতাই চন্দ্র দাস বলেন, “বাঁশ-বেতের জিনিসের দাম আগের মতো থাকলেও কাঁচামালের দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এখন লাভ তো দূরের কথা, সংসারই চলতে চায় না।” তিনি আরও বলেন, “নারীরা এখনও এই পেশায় থাকলেও পুরুষরা দিন দিন সরে আসছেন। সংসার চালানোই যখন কঠিন, তখন ছেলেমেয়ের লেখাপড়া চালাব কীভাবে?”
সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা না পেলে এ ঐতিহ্যবাহী শিল্প হারিয়ে যেতে বসবে বলে আশঙ্কা করেন এলাকাবাসী। তারা জানান, এনজিওগুলো সাপ্তাহিক কিস্তিতে ক্ষুদ্র ঋণ দিলেও সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে জমি না থাকায় কোনো সহায়তা মেলে না।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কুমিল্লার উপমহাব্যবস্থাপক মো. মুনতাসীর মামুন বলেন, “এই পল্লী পরিদর্শনের পর আমরা তাদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবগত হয়েছি। বিসিকের মাধ্যমে নিবন্ধনের পর তাদের ঋণ সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ করে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।”
হারিয়ে যাচ্ছে লাঙল-জোয়ালের ঐতিহ্য
এখন প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন। নইলে একদিন হয়তো কুমিল্লার গর্ব—নমশূদ্র পল্লির বাঁশ-বেত শিল্প ইতিহাসে পরিণত হবে।