প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ১৫, ২০২৬, ১:০৬ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ ফেব্রুয়ারী ১৭, ২০২৬, ১২:৩৪ এ.এম

সোমবার রাতে বিদায়ী ভাষণ দেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড.মুহাম্মদ ইউনূস।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ী উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানাই।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ, ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্মিলিতভাবে একটি প্রশংসনীয় নজির সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত—এই নির্বাচন তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে।
১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রাক্কালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আজ আমি আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে উপস্থিত হয়েছি।’ এ সময় তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময়ের কথা উল্লেখ করেন। তিনি কীভাবে দায়িত্বে এলেন, সেই ব্যাখ্যা দেন।
দায়িত্ব পালনের চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সরকারের ভেতরে যারা পালিয়ে যায়নি, তাদের মধ্যে কাকে বিশ্বাস করবেন, কাকে করবেন না—এটি মহাসংকট হয়ে দাঁড়াল। যতই মৃতদেহের, অঙ্গপ্রত্যঙ্গহীন দেহের সন্ধান আসছিল, ততই তারা চিহ্নিত হচ্ছিল। তিনি বলেন, দেড় যুগ পর দেশে একটি জাতীয় নির্বাচন এবং ব্যাপক সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য সর্বসম্মত জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠান হলো। এই নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ, দেশের সর্বত্র একটা ঈদের পরিবেশ ছিল, যা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে জয়ী ও পরাজিত সবাইকে অভিনন্দন জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যাঁরা জয়ী হয়েছেন, তাঁরা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন। যাঁরা জয়ী হতে পারেননি, তাঁরাও মোট ভোটের অর্ধেক পেয়েছেন। যাঁরা জয়ী হতে পারেননি, তাঁরা এই জেনে আশ্বস্ত হবেন যে প্রায় অর্ধেক ভোটার আপনাদের ওপর আস্থা রেখেছে। আগামী দিন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে—এর মাধ্যমে আমাদের ১৮ মাসের দায়িত্বের সমাপ্তি হবে।’
সরকারে থাকার সময় প্রচেষ্টার কোনো ঘাটতি ছিল না উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনীতি ও প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রেখেছি। ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, আর্থিক সংস্কারে হাত দিয়েছি; যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেকে স্থাপন করতে না পারে। আর সর্বোপরি আমরা একটি উৎসবমুখর, অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেছি, যার মাধ্যমে জনগণ আবার তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে।’ এর জন্য জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ, আহতদের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী এক উত্তাল সময়ে দেশকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন প্রধান উপদেষ্টা। একই সঙ্গে যখনই কোনো সংকটময় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তখনই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দিয়েছেন। তাঁরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও সংযমই দেশকে অস্থিরতার পথ থেকে স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সংস্কার বাস্তবায়ন
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেয়ালে দেয়ালে তরুণেরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন এঁকেছিল, এর কেন্দ্র ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে। প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এসব সংস্কার নাগরিক অধিকারকে সংহত করেছে, বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে। এ ছাড়া গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি যেন আর কখনো ফিরে না আসে, সেটা নিশ্চিত হয়েছে।
ধাপে ধাপে পুলিশের নাজুক অবস্থা ঘটানো হয়েছে জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এখন পুলিশ আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না। বেআইনিভাবে কাউকে তুলে নিয়ে যায় না। ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে হত্যা করে না। পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর ভয়ে কাউকে ‘ডিলিট বাটন’ চাপতে হয় না। জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে।