1. muktanganpratidin@gmail.com : admin :
রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬, ০১:১২ পূর্বাহ্ন

খরস্রোতা রাংসা নদী,দখল দুষণে মরা খাল! অস্তিত্ব সংকটে জীববৈচিত্র্য

নীহার বকুল : ময়মনসিংহ জেলা সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২০ বার পঠিত
আমার একটি নদী ছিল জানলো নাতো কেউ”
এই গানের সাথে চরম ভাবে মিল রেখে বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে নিরবে নিভৃতে হারিয়ে যাচ্ছে ময়মনসিংহের প্রমত্তা রাংসা নদী।রাংসা নদীর পানি এক সময় প্রবল বেগে চলত,পানির ঢেউ দুই তীরের মানুষের কানে আনন্দের বার্তা দিতো।তারাকান্দা উপজেলা’র সর্ববৃহৎ নদী হলো রাংসা,এক সময়ের প্রমত্তা ও খরস্রোতা রাংসা নদীটি মানবসৃষ্ট অত্যাচারে আজ মৃতপ্রায়, একসময় আমরাই একে “মরা রাংসা” নামে ডাকতাম আর বর্তমান প্রজন্ম ডাকে মরা খাল।দেখে বোঝার উপায় নেই,এটি নদী ছিল,কারণ কচুরিপানা ও ময়লা আবর্জনার ভাগাড় এবং জলজ ঘাসে এমনভাবে ছেয়ে গেছে যেন গ্রামের বুক চিড়ে চলা বিস্তীর্ণ এক সবুজ মাঠ!
রাংসা নদীর উৎপত্তিস্থল হলো পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ,দৈর্ঘ্য ৩০ কিলোমিটার গড়প্রস্ত ৩০ মিটার গড় গভীরতা ৫ মিটার।রাংসা শুরু হয়েছে ফুলপুর উপজেলার দক্ষিণে বুড়বুড়িয়া বিল থেকে। তারাকান্দা উপজেলার ঢাকুয়া এলাকার ধলাই নদীর সঙ্গে মিশে নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার কংস নদীতে গিয়ে মিশেছে। একটি শাখা নদী মগড়াতেও মিলিত হয়েছে।রাংসার প্রবাহিত এলাকা হলো ফুলপুর উপজেলার কিছু অংশ এবং অধিকাংশ এলাকা তারাকান্দা উপজেলায়।ব্রহ্মপুত্র নদের এ শাখা নদীটির আরেকটি শাখা হলো কালিয়ান নদী। যা তারাকান্দা উপজেলার গালাগাঁও ইউনিয়নে গিয়ে বিভক্ত হয়েছে।
যেভাবে প্রমত্তা রাংসাকে ধ্বংস করা হয়েছে তা শুনলে রূপকথার গল্পকেও হার মানাবে,নদী বেঁচে থাকলে মানুষ ও প্রকৃতি বেঁচে থাকবে তা এদের কর্ণকুহরে পৌঁছে না। নদীটিতে যত্রতত্র বাঁধ দিয়ে, পুকুর দিয়ে ও মাছের ঘের বানিয়ে,অবাধে মাটি ও বালু উত্তোলন করে প্রতিনিয়ত একে মেরে ফেলা হচ্ছে। অথচ এক সময় এ নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল আজকের এই জনপদ ও নামকরা  হাটবাজার গুলো,টঙ্গীরঘাট,নিমতলা,তারাকান্দা, দাদরা,চংনাপাড়া,হরিয়াগাই বাজারগুলোতে যাত্রী আর মালামাল পরিবহণের একমাত্র নদীপথ ছিল।এইতো কিছুদিন আগেও পালতোলা নৌকা দিয়ে জারী,সারী,ভাটিয়ালি গান গেয়ে মাঝিরা নাইউড়ি কে নাইওর নিয়ে যেতো আত্মীয় পরিজনের বাড়ি, মনের সুখে মাছ ধরতো জেলে ও সাধারণ মানুষ, দাঁড়টেনে শতশত মণের ভারবাহি নৌকা,ট্রলার মালবোঝাই ধান,পাট,আলু সহ অনেক উৎপাদিত ফসল এনে জড়ো করত তারাকান্দা বাজারের বড় ব্রীজ(পুল) সংলগ্ন ঘাটে।ইঞ্জিনবাহিত ট্রলার নামার পরও কিছুদিন আগেও সচল ছিল এই ঘাট।আজ আমাদের মানবসৃষ্ট বাধাবিপত্তিতে সব শেষ!ঘাটটি এখন পরিনত হয়েছে বাজারের ময়লা ফেলার ভাগাড়।
সেই নদীর পানিতে এখন আর্বজনার দুর্গন্ধ মশার উপদ্রব।তারাকান্দা বাজারের পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে চলা এ নদীকে নিয়ে কয়েক ধরনের চক্র ফায়দা লুটেছে।কেউ কেউ নদীর দুই পারের জমি  দখল করেছে। দখলকারীদের কেউ কেউ নিজের নামে তা রেকর্ডও করে নিয়েছে যদিও তা আইনত নিষিদ্ধ।দখলকারদের কারণে রাংসা নদী পরিণত হচ্ছে মরা খালে। তারাকান্দা বাজারের পশ্চিম প্বার্শেসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ১৫-২০ফুট দৈর্ঘ্য অবশিষ্ট্য আছে সরেজমিনে দেখা গেছে। দেশের স্বাধীনতা অর্জনের কয়েক বছর যেতে না যেতেই শুরু হয় নদী পাড়ের জমি অবৈধ ভাবে দখলের মহোৎসব।এছাড়াও বর্তমানে তারাকান্দা বড়পুলের পশ্চিমঘাটের অংশের দিকে  তারাকান্দা বাজারের সকল ময়লা আবর্জনা ফেলে ভাসমান ময়লার ভাগাড়ে পরিনত করা হচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগায়,হাইওয়ে রোডসহ এখান দিয়ে চলাচলকারী যাত্রীরা নাকে রোমাল চেপে রাস্তা অতিক্রম করে।এক্ষেত্রেও মনে হয় কর্তৃপক্ষীয় উদাসীনতা-দায়িত্বহীনতা সেইসাথে অদূরদর্শিতা সর্বাংশে দায়ী।ইতিপূর্বে রাজনৈতিক হীন সংর্কীণ স্বার্থ সিদ্ধির ক্ষেত্রে অভিযোগের আঙ্গুল উঠেছে পরোক্ষ ভাবে দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে। বারবার বিভিন্ন পরিষদে বিষয়টি উত্থাপিত হবার পরও কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙ্গেনি। একটি নদীর অপমৃত্যু হারিয়ে যাচ্ছে নাব্যতা ও অস্তিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাধ,ধ্বংস হয়ে যাবে কোটি টাকায় নির্মিত বেশ ক’টি সেতু তবুও নির্বিকার প্রশাসন।বেশ কিছুদিন ধরে দাদরা ব্রীজ হতে হরিয়াগাই ব্রীজ পর্যন্ত ৮/১০টি পয়েন্টে কারো অনুমতি না নিয়েই দেদারসে বালু ও মাটি কেটে নিচ্ছে প্রভাবশালী মহল বিক্রি করছে রাস্তা উন্নয়নে।জনপ্রতিনিধি সহ প্রশাসনের কারো কোন মাথা ব্যথা নেই।যেন এক মগেরমুল্লুক!জীবিকা নির্বাহ করতে এ নদীর তীরে তীরে বসতি গড়ে তুলে  ছিলো অনেক জেলে ও কৈবর্ত পরিবার,আজ তারা বেকার নয়তো চলে গেছে অন্য পেশায়। নদীতে নানান রং বাহারী নামের ৪৮/৫২ প্রজাতির মিঠাপানির মাছের অভ্যয়ারণ্য ছিলো ,আজ সবকিছু গালগল্প মনে হবে, এখন মাছের অস্তিত্ব সংকট।নৌকা বাইচ তো এখন অলিক কল্পনা।আমার জানামতে,এখানে কোন বালু মহাল বা সায়রাত মহাল ইজারা দেওয়া হয়নি,তারপরও কাদের স্বার্থে এভাবে মৃতপ্রায় নদীকে গলাটিপে শেষ করে দিচ্ছে কিছু দখলকার, বালু খেকো আর ঘের ব্যবসায়ীগণ।আগে রাজনৈতিক বা সরকারের কারণে চাপে থাকলেও বর্তমানে কি কারণে প্রশাসন নিরব?এই প্রশ্ন আমজনতার। নদীতে ঘের দিয়ে পানিপ্রবাহ আটকে রাখছে,পুরো নদীতে ১০০ উপরে বিভিন্ন ধরনের বাঁধ দিয়ে নদীর স্বভাবসুলভ গতিপথ বন্ধ করে মৎস্যসম্পদ নিধন করছে।দখলের মাধ্যমে মাটি বিক্রয় ঘরবাড়ি নির্মাণ চলছে।যেসব স্থানে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে,শুধু সেখানেই কিছু পানি চোখে পড়ছে।
রাংসা নদীর এমন করুণ অবস্থার কারণে বেশ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে,ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার এ নদীটি এখন গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকের।নদীর পানিপ্রবাহ বন্ধ করে ঘের দিয়ে মাছ চাষ এবং বিভিন্ন স্থানে বাঁধের কারণে ফসলি জমি হয়ে পড়ছে অনাবাদি।আর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অধিকাংশ পুল কালভার্টের মুখে বাধ দেওয়ায় ফুলপুরের রহিমগঞ্জ তারাকান্দার কাকনী,বালিখা,তারাকান্দা, কামারিয়া,গালাগাঁও এবং কামারগাঁও এই ৬ টি ইউনিয়নের বিশেষ করে ধন্তা,তিলাটিয়া,পূর্ব-পশ্চিম পাগুলি,দাদরা,চৌকিপাড়া,বরইবাড়ি, মাসকান্দা,মধুপুর,তারাকান্দা,কয়ড়াকান্দা,ধলীরকান্দা,বনপলাশিয়া,সাদীপুর,হীরারকান্দা,গোয়ালকান্দি,মানিকদীর,বাটিয়া,বাহিরকান্দা,রায়জান সহ নিশুন্দাকান্দির হাজারো হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয় কৃষকগণ অভিযোগ করেন। ইতিমধ্যে রাংসার বুকে শেষ পেরেক হিসেবে ঢুকেছে বালু তোলার ড্রেজার।বেশ কিছু জায়গায় ব্রীজের পাশ থেকে বালুমাটি তুলার জন্য কোটি টাকায় নির্মিত ব্রীজগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন।আর প্রভাবশালী লুটেরাদের দেখে আমজনতা  প্রতিবাদও করতে পারে না বলে এ প্রতিনিধির কাছে জানান। তাদের দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই বলে আক্ষেপ করেন। এ বিষয়ে জানতে কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষিকর্মকর্তার সাথে কথা বললে তিনি জানান,চলতি আমন মৌসুমে অন্তত ছয় হাজার হেক্টর জমিতে কৃষক চাষাবাদ করতে পারেননি। বাস্তবতার চিত্র আরও ভয়াবহ বলে দেখা যাচ্ছে। জলবদ্ধতার জন্য আমন ফসলের আবাদ অর্ধেকে নেমে এসেছে। জনশ্রুতি আছে রাংসা নদীর নাম নিয়ে,”রাংসা” শব্দটি মূলত মান্দিরা (গারো) নিজেদের নামের টাইটেল হিসেবে ব্যবহার করে। নদীটি ঘিরে এক সময় মান্দিদের বসবাস ছিল নজরকাড়ার মতো। সেখান থেকেই এ নাম হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের।
এই ঐতিহ্যবাহী নদীটিকে বাঁচাতে এলাকার জীব বৈচিত্র্য রক্ষা করতে ইকোসিস্টেম ধরে রাখতে অবিলম্বে নদীজুড়ে বাঁশের বানা  উচ্ছেদ করতে হবে।যে বাঁধ গুলো দেওয়া হয়েছে তা অপসারণ করতে হবে,বিভিন্ন স্থানে জালের ঘের এবং স্থায়ী মাটি দিয়ে পাড় নির্মাণ করে মাছ চাষ করছেন প্রভাবশালীরা,এতে মৎস্য চাষে বিপ্লব ঘটলেও মরতে বসেছে রাংসা তাদের হাত থেকে নদীটি উদ্ধার করতে হবে।স্থানীয়রা আরো জানান যে, উপজেলাজুড়েই অপরিকল্পিত পুকুর খনন,খাল-বিল দখল করে মাছ চাষ করায় পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে।বিভিন্ন স্থানে পানি আটকে কৃষকের ফসলের আবাদ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ব্যাপারে এখন  উপজেলা প্রশাসন,জেলা প্রশাসন,পানি উন্নয়ন বোর্ড সহ সবার নজর দিতে হবে।পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান চালানো এখন অতি আবশ্যক বলে মনে করেন।সেইসঙ্গে নদীর সিএস নকশা দেখে তা উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করতে হবে।
রাংসা নদী নিয়ে আক্ষেপ করে ব্রহ্মপুত্র সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক আবুল কালাম আল আজাদ বলেন,নদীটির বর্তমান অবস্থা এলাকার  জীববৈচিত্র্যে চরম নেচিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে,এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। বর্তমান অবস্থার দায়ও প্রশাসনের।তারাকান্দার বিশিষ্ট শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির প্রবাদ পুরুষ কবি সরকার আজিজ বলেন,নদী ও খালে বাঁধ অপসারণ করা জরুরী। রাংসা পাড়ের কবি হোছেন আলী মিয়ার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন,নদীটি খননের জন্য বার বার তাগিদ দিতেন।জীববৈচিত্র ধরে রাখতে নদীকে বাচিয়ে রাখতে হবে,বালু খেকু,ড্রেজার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।সেই সাথে অবৈধ দখল মুক্ত করে খনন করা দরকার।
তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আমিনুল ইসলাম বলেন,জলাবদ্ধতা নিরসনে তারা কাজ করে যাচ্ছেন।অতিদ্রুত নদী ও খালের বাঁধগুলো অপসারণ করা হবে। নদীটি খননের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হবে।আর ড্রেজার বসিয়ে বালু তুলতে কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে কিনা আমার জানা নেই,আমি নতুন যোগদান করেছি, বিগত দিনে অনিয়ম কিছু হয়ে থাকলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। নদীতে আর আবর্জনা ফেলতে দেওয়া হবেনা বলেও আশ্বস্ত করেন।
রাংসা নদী করুণ দশার দায় পরিবেশ মন্ত্রণালয় এড়িয়ে যেতে পারেন না,তাদের কোন ধরনের নজরদারি নেই বললেই চলে,এ বিষয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও মন্ত্রী মহোদয়ের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যে নদী ও খাল খনন কর্মসূচী হাতে নিয়েছেন। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রাংসা নদী সহ উপজেলার অন্যান্য নদ নদী,খালবিল, সরকারী পুকুরগুলো দখলমুক্ত করে খনন করে আগের রূপে ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানান নবনির্বাচিত সাংসদ মুফতি মুহাম্মদুল্লাহ।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর

Archives

Apr0 Posts
May0 Posts
Jun0 Posts
Jul0 Posts
Aug0 Posts
Sep0 Posts
Oct0 Posts
Nov0 Posts
Dec0 Posts
Mar0 Posts
Apr0 Posts
May0 Posts
Jun0 Posts
Jul0 Posts
Aug0 Posts
Sep0 Posts
Oct0 Posts
Nov0 Posts
Dec0 Posts

Archives

Apr
May
Jun
Jul
Aug
Sep
Oct
Nov
Dec
Mar
Apr
May
Jun
Jul
Aug
Sep
Oct
Nov
Dec
All rights reserved © 2025
Design By Raytahost
HTML Snippets Powered By : XYZScripts.com