সাভার ও আশুলিয়ায় বর্তমান পরিস্থিতি কেবল সাধারণ দুর্ভোগের পর্যায়ে নেই; এটি ক্রমেই একটি গভীর মানবিক ও ব্যবস্থাপনা সংকটে রূপ নিচ্ছে। তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং এবং নিয়ন্ত্রণহীন মশার উপদ্রব—এই তিনটি সংকট একসাথে আঘাত হেনে জনজীবনকে কার্যত স্থবির করে দিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এসব সমস্যা হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার ফল।
দেশজুড়ে চলমান তাপপ্রবাহের প্রভাব সাভারেও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করলেও বাস্তবে অনুভূত তাপমাত্রা আরও কয়েক ডিগ্রি বেশি। এতে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার ঝুঁকি বেড়েছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাপপ্রবাহজনিত মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছরই তাপপ্রবাহ দেখা দিলেও কার্যকর ‘হিট অ্যাকশন প্ল্যান’ না থাকায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
অন্যদিকে, সাভারে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। অনেক এলাকায় দিনে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, যার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ ঘাটতি প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও নাজুক, যেখানে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এতে সাধারণ জীবনযাত্রা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে ক্ষোভ ও হতাশা।
মশার উপদ্রব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দিন-রাত কোনো সময়ই স্বস্তি মিলছে না বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বাড়লেও মশক নিধন কার্যক্রমকে অকার্যকর বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। অনেকের অভিযোগ, নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হলেও তাতে কার্যকর ফল মিলছে না। ফলে এটি এখন একটি নীরব জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
এই ত্রিমুখী সংকটে মানুষের দৈনন্দিন জীবন একপ্রকার অচল হয়ে পড়েছে। গরমে ঘরে ফ্যান চালানোর জন্য বিদ্যুৎ প্রয়োজন, কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষ বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছে; বাইরে গেলে মশার আক্রমণে অতিষ্ঠ হতে হচ্ছে। আবার রাতে জানালা খুললে মশার উপদ্রব আরও বেড়ে যায়। ফলে ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তি নেই।
শিল্পখাতেও এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। সাভার-আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট ও জ্বালানি সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে, শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হচ্ছে, এমনকি ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। এতে রপ্তানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। সন্ধ্যার পর দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। তীব্র গরম ও মশার কারণে ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ, মশা নিধন এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বর্তমান বাস্তবতায় সাভারের মানুষের প্রশ্ন একটাই—এই পরিস্থিতির অবসান কবে?

