২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলাগুলো নিয়ে এখন দেখা দিয়েছে নতুন বিতর্ক। ন্যায়বিচার ও দায় নির্ধারণের প্রত্যাশায় করা বহু মামলার আড়ালে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আর্থিক লেনদেন এবং প্রেম-পরকীয়াজনিত বিরোধ জড়িয়ে পড়ার তথ্য মিলেছে তদন্তে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—গণঅভ্যুত্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকেও কি কেউ কেউ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে?
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, চলমান তদন্তে এমন বহু মামলার সন্ধান পাওয়া গেছে যেখানে অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার মিল নেই। কোথাও জীবিত ব্যক্তিকে ‘নিহত’ দেখানো হয়েছে, কোথাও পূর্বশত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানো হয়েছে। আবার কোনো কোনো ঘটনায় বাদী নিজেই জানেন না তার নামে মামলা হয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কিছু মামলায় পরকীয়াজনিত হত্যাকাণ্ডকে ‘আন্দোলনের সহিংসতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোথাও জমিজমা বা পারিবারিক বিরোধকে হত্যা কিংবা গুমের মামলায় রূপ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ডিভোর্সের প্রতিশোধ নিতে আত্মীয়স্বজনকে ফাঁসানোর অভিযোগও উঠেছে।
পিবিআইর তথ্যমতে, চলতি বছরের ২২ এপ্রিল পর্যন্ত জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট ১৯৫টি মামলার তদন্তভার পেয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে তদন্ত শেষে ২৪টি মামলার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আরও ২০টি মামলা বাদীপক্ষ আদালত থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, অনেক ক্ষেত্রেই সত্য উদঘাটনের আশঙ্কায় এসব মামলা তুলে নেওয়া হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে কিছু বিস্ময়কর ঘটনাও। এক মামলায় নিহত দাবি করা ব্যক্তি জীবিত পাওয়া গেছেন। অন্য একটি ঘটনায় অভিযোগ করা হয় আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার; কিন্তু তদন্তে দেখা যায় ভুক্তভোগী ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। কোথাও আবার মামলার বাদী, ভুক্তভোগী, মোবাইল নম্বর ও ঠিকানার মধ্যে কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের আবেগকে কাজে লাগিয়ে অনেকেই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এতে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের বিচার প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে পড়ছে।
এদিকে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ৫ আগস্টের পর দায়ের হওয়া মামলাগুলো জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। যেসব মামলায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিরীহ মানুষকে আসামি করা হয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হবে বলেও জানান তিনি।
পিবিআইর তথ্য অনুযায়ী, যাচাই হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে মোট ৮ হাজার ৭২৮ জনকে আসামি করা হয়েছিল। তদন্তে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ১৭৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ৫ হাজার ৫৫৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ না মেলায় অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় গণহারে মামলা হওয়ার সুযোগে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের প্রবণতা নতুন নয়। তবে গণঅভ্যুত্থানের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন অপব্যবহার বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই প্রতিটি মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত ও তথ্যভিত্তিক যাচাই এখন সময়ের দাবি।