
বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্যগুলোর একটি চাল। ফলে চালের দামের সামান্য পরিবর্তনও পারিবারিক ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। তবে ২০২৬ সালের বাজারচিত্র বলছে, সব ধরনের চালের দাম একইভাবে বাড়েনি। সাধারণ চালের বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা থাকলেও সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম চালের দামে সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
▪️২০২৫ সালে চালের বাজারে বড় মূল্যচাপ
২০২৫ সালে চালের বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ ছিল স্পষ্ট। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (GED) জানিয়েছিল, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চালের মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে ছিল এবং ২০২৫ সালের জুনে তা ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশে পৌঁছায়।
পরবর্তীতে সরকারি পদক্ষেপ, আমদানি এবং সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির ফলে ২০২৫ সালের শেষদিকে চালের বাজারে কিছুটা স্বস্তির লক্ষণ দেখা যায়।
২০২৬ সালে সাধারণ চালের চিত্র কী?
এ বছরের পরিস্থিতি আগের বছরের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) ৪ সেপ্টেম্বরের বাংলাদেশ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬-এ দেশের চালের দাম বছরওয়ারি হিসাবে প্রায় ৫ শতাংশ কম ছিল।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ২৪ সেপ্টেম্বরের দৈনিক বাজারদর অনুযায়ী, আমন সরু চাল ৭২–৭৫ টাকা, মাঝারি ৫৬–৬০ টাকা এবং মোটা ৪৮–৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে বোরো সরু চাল ৬৬–৭০ টাকা, মাঝারি ৫৫–৫৭ টাকা এবং মোটা চাল ৪৭–৪৯ টাকা কেজি দরে রয়েছে।
অর্থাৎ ২০২৬ সালে সব ধরনের সাধারণ চালের দাম গত বছরের তুলনায় বেড়েছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
▪️কিন্তু সুগন্ধি চালে কেন এত চাপ?
বাজারের দ্বিতীয় চিত্রটি দেখা যাচ্ছে সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম চালের ক্ষেত্রে।
আগস্টে চিনিগুঁড়া চালের দাম দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ১৯০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২৩০ টাকা কেজিতে ওঠার তথ্য পাওয়া যায়। সেপ্টেম্বরে ঢাকার কয়েকটি বাজারের প্রতিবেদনে খোলা সুগন্ধি চাল প্রায় ২০০ টাকা এবং প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল ২২০–২৪০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রির তথ্য এসেছে।
তবে এই মূল্যবৃদ্ধির একক কোনো কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রপ্তানি, সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বাজার ব্যবস্থাপনা—বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
▪️রপ্তানি কমল, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই গেল
সুগন্ধি চালের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সরকার ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুমোদিত ২৭৮ রপ্তানিকারকের রপ্তানি কোটা ৫০ শতাংশ কমিয়েছে। আগের অনুমোদিত পরিমাণ ছিল মোট ৪৫ হাজার ২৭০ টন। তবে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ১২৯টি প্রতিষ্ঠান মোট ২ হাজার ৪১৯ দশমিক ৪৩ টন চাল রপ্তানি করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ অনুমোদিত কোটার বড় অংশ তখনও ব্যবহার হয়নি।
এই তথ্য থেকে শুধু এটুকুই বলা যায়—রপ্তানির অনুমোদিত কোটার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকা অবস্থায়ও সুগন্ধি চালের দাম বেড়েছে। তাই মূল্যবৃদ্ধির পুরো কারণ হিসেবে শুধু রপ্তানিকে দায়ী করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই।
▪️আমদানির চাল নিয়েও প্রশ্ন
অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানি করা প্রায় ১২ হাজার টন সিদ্ধ চালের সরবরাহ গুদাম ব্যবস্থাপকদের আপত্তির পর বন্ধ রাখার খবর এসেছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে এর মধ্যে প্রায় ৯২৫ টন থেকে এক হাজার টন চাল পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত হিসেবে আলাদা রাখার কথা বলা হয়েছে। অবশিষ্ট চালের মান নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
আমদানিকৃত চালের এই পরিস্থিতি বাজারের মোট সরবরাহে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নির্ধারণে আরও সরকারি তথ্য প্রয়োজন।
▪️জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার নতুন চাপ
এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারে পড়ার খবরও এসেছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার একটি অংশ পণ্যের দামে যুক্ত হয়। তবে চালের প্রতিটি জাতের দাম কতটা শুধু পরিবহন ব্যয়ের কারণে বেড়েছে, সেটি আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।
তাহলে বাস্তব চিত্র কী?
বর্তমান তথ্যগুলো পাশাপাশি রাখলে তিনটি বিষয় সামনে আসে।
প্রথমত, ২০২৬ সালে সাধারণ চালের সামগ্রিক বাজারকে ২০২৫ সালের তুলনায় সর্বত্র বেশি বলা যাচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত, সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম চালের বাজারে আলাদা ধরনের মূল্যচাপ তৈরি হয়েছে। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে চিনিগুঁড়া ও অন্যান্য সুগন্ধি চালের দাম দ্রুত বেড়েছে।
তৃতীয়ত, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রপ্তানি, সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, আমদানির মান এবং পরিবহন ব্যয়সহ একাধিক বিষয় থাকতে পারে। কিন্তু কোন কারণ কতটা দায়ী, তা নির্ধারণে আরও বাজারভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন।
সাভারের বাজারে নজরদারি কেন জরুরি?
ঢাকার পাশের গুরুত্বপূর্ণ জনবসতি হিসেবে সাভারে চালের স্থানীয় বাজারদর আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। জাতীয় বা ঢাকার বাজারদর দিয়ে সাভারের খুচরা বাজারের পুরো চিত্র বোঝা যায় না।
বিশেষ করে মোটা, মাঝারি, সরু, নাজিরশাইল ও মিনিকেট—এই ধরনের চালের পাইকারি ও খুচরা দামের পার্থক্য নিয়মিত নথিভুক্ত করা হলে কোথায় অস্বাভাবিক ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, তা বোঝা সহজ হবে।
ভোক্তাদেরও একই ধরনের চালের দাম একাধিক দোকানে যাচাই করে কেনার অভ্যাস করা এবং অস্বাভাবিক মূল্য চাইলে রসিদ সংরক্ষণ করা উপকারী।