
একজন নারী কী পোশাক পরলেন, কার সঙ্গে কোথায় গেলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী মন্তব্য করলেন কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে কী ঘটল—এসব নিয়ে মুহূর্তেই তৈরি হচ্ছে সংবাদ। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একই ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে একের পর এক প্রতিবেদন, ভিডিও ও বিশ্লেষণ। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বাড়ছে ভিউ, লাইক, শেয়ার ও মন্তব্যের সংখ্যা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব সংবাদ দিয়ে সমাজ কতটা উপকৃত হচ্ছে?
আজকাল সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ যেন সংবাদমূল্যের চেয়ে ভাইরাল হওয়ার সম্ভাবনাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কোনো একজন আলোচিত নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হলেই তাঁকে ঘিরে শুরু হয় সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতা। অথচ তাঁর জনপ্রিয়তার সামাজিক ভিত্তি কী, তাঁর কর্মকাণ্ডের ইতিবাচক প্রভাব কী কিংবা তাঁকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের প্রকৃত জনস্বার্থ কোথায়—সেসব প্রশ্ন অনেক সময়ই অনালোচিত থেকে যায়।
একবার ভেবে দেখুন, উপকূলের কোনো মা প্রতিদিন নদীভাঙনের আতঙ্কে সন্তান নিয়ে জীবনযাপন করছেন। কোনো জেলে নিষেধাজ্ঞার সময় জীবিকার সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। কোনো কিশোরী বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। কোনো গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট, হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার অভাব কিংবা মানুষের চলাচলের সড়কটি বছরের পর বছর সংস্কারহীন পড়ে আছে। এসব বাস্তবতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে লাখ লাখ ভিউ পাওয়া যায় না। কিন্তু একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বদলে দিতে পারে বহু মানুষের জীবন।
অন্যদিকে, একজন আলোচিত ব্যক্তির ব্যক্তিগত ঘটনা নিয়ে কয়েক মিনিটের ভিডিও লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। একই ঘটনা নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যম শিরোনাম তৈরি করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সংবাদমাধ্যম কি এখন সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে সামনে আনার পরিবর্তে মানুষের সাময়িক কৌতূহলকে পুঁজি করে প্রতিযোগিতায় নেমেছে?
এখানে নারীদের জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বও বিবেচনা করা জরুরি। কোনো নারী জনপ্রিয় হলেই তাঁর সংবাদ প্রকাশে আপত্তি থাকার কথা নয়। নারীর সাফল্য, সংগ্রাম, নেতৃত্ব, উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা কিংবা সমাজ পরিবর্তনে অবদান অবশ্যই সংবাদ হওয়ার যোগ্য। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন কিংবা সাময়িক আলোচনাকে জনস্বার্থের সংবাদ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা কতটা যৌক্তিক, সেটি নিয়ে ভাবতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সাংবাদিকদের কাছে—একজন ভাইরাল ব্যক্তির প্রতিটি কর্মকাণ্ড সংবাদ হওয়ার যোগ্য হয়ে উঠছে, অথচ একজন সংগ্রামী নারী, যিনি শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের শিক্ষিত করছেন কিংবা সমাজের জন্য কাজ করছেন, তিনি কেন সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় আসছেন না?
একজন কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, একজন শ্রমিকের বকেয়া মজুরি, নদীভাঙনে নিঃস্ব পরিবারের কান্না, চিকিৎসার অভাবে অসহায় মানুষের দুর্ভোগ কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনে বিপন্ন উপকূলের মানুষের জীবন—এসব কি আমাদের সংবাদ হওয়ার জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়?
সাংবাদিকতা কোনো বিনোদন প্রতিযোগিতা নয়। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু মানুষকে বিনোদিত করা কিংবা ক্লিক বাড়ানো নয়; বরং সত্য তুলে ধরা, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অবহেলিত মানুষের কণ্ঠস্বর হওয়া এবং সমাজের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরা।
ভিউ দরকার, পাঠক দরকার, সংবাদমাধ্যমের টিকে থাকাও জরুরি। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতায় যদি সংবাদমূল্য, পেশাগত নৈতিকতা ও জনস্বার্থ বিসর্জন দিতে হয়, তাহলে সাংবাদিকতার মৌলিক উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
মনে রাখতে হবে, একজন ভাইরাল মানুষের জনপ্রিয়তা হয়তো কয়েক দিনের আলোচনার জন্ম দেয়, কিন্তু একজন অবহেলিত মানুষের জীবনসংগ্রামের সত্য প্রকাশ একটি সমাজের বিবেককে নাড়া দিতে পারে।
তাই সময় এসেছে সাংবাদিকতার অগ্রাধিকার নতুন করে ভাবার। সংবাদমাধ্যম কাকে তারকা বানাবে, কাকে আলোচনায় আনবে এবং কোন বাস্তবতাকে মানুষের সামনে তুলে ধরবে—এই সিদ্ধান্ত শুধু ভিউয়ের হিসাব দিয়ে হওয়া উচিত নয়।
কারণ সংবাদমাধ্যমের কাজ কেবল ট্রেন্ড অনুসরণ করা নয়, বরং সমাজকে সঠিক বিষয় নিয়ে ভাবতে শেখানো