
ঢাকার অদূরে সবুজে ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশস্ত মাঠ। বিকেলের আলো গড়িয়ে পড়ছে ঘাসের উপর, আর সেই মাঠজুড়ে ছুটে চলেছে ছোট ছোট স্বপ্ন। ব্যাট-বল আর ফুটবলের দৌড়ে সেখানে তৈরি হচ্ছে আগামী দিনের সম্ভাবনা। এই গল্প এক স্বপ্নবাজ মানুষের—আব্দুর সবুর খান স্বপন, Co-owner, Elite Sports Academy—যার সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই জন্ম নিয়েছে একটি ব্যতিক্রমধর্মী ক্রীড়া উদ্যোগ।
শুরুর গল্প:
পেশায় শিক্ষক আব্দুর সবুর খান স্বপন একসময় লক্ষ্য করেন, করোনা মহামারির সময়ে শিশু-কিশোররা ক্রমশ আটকে পড়ছে প্রযুক্তির জালে। ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইল কিংবা টিভির পর্দায় বন্দি হয়ে পড়ছিল তাদের শৈশব। অভিভাবকদের উদ্বেগ আর অনুপ্রেরণা তাকে ভাবতে বাধ্য করে—এই প্রজন্মকে ফিরিয়ে আনতে হবে মাঠে, খেলায়, প্রাণের স্পন্দনে।
সেই চিন্তা থেকেই যাত্রা শুরু হয় Elite Sports Academy-এর, যার স্লোগান—“Sports for Life”।
বর্তমান কার্যক্রম:
বর্তমানে এই একাডেমিতে ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের নিয়মিত ক্রিকেট ও ফুটবল প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যদিও ১৯ বছর পর্যন্ত ভর্তি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রশিক্ষণ নিচ্ছে মূলত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সন্তানরা, পাশাপাশি বাইরের অনেক শিশুও যুক্ত হয়েছে বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে।
অভিভাবকদের ভাষায়, একাডেমি চালু হওয়ার পর তাদের সন্তানদের জীবনধারায় এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন—
“বাসার ডিভাইসগুলো এখন প্রায় অচল। বাচ্চারা এখন মাঠমুখী, খেলাধুলায় মনোযোগী।”
প্রশিক্ষণ ও পরিবেশ:
সপ্তাহে দুই দিন—শুক্রবার ও শনিবার—চলছে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। মাত্র এক হাজার টাকা মাসিক ফিতে শিশুদের দেওয়া হচ্ছে মানসম্মত কোচিং। এখানে রয়েছেন চারজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কোচ, যারা উচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন।
এছাড়াও রয়েছে একজন অভিজ্ঞ ফিজিও, যা শিশুদের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রতিভার সন্ধান:
একাডেমির প্রশিক্ষকদের মতে, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে খেলার সম্ভাবনা লক্ষ্য করা গেছে। নিয়মিত পরিচর্যা ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তারা ভবিষ্যতে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ:
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কার্যক্রম পরিচালনা করায় বড় ধরনের কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকলেও, আর্থিক সীমাবদ্ধতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিশেষ করে দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ ও একাডেমির সার্বিক পরিচালনায় কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।
শিশুদের আগ্রহ:
এই একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে শিশুদের আগ্রহই সবচেয়ে বড় শক্তি। অভিভাবকদের চাপ নয়, বরং নিজেদের আগ্রহ ও ভালোবাসা থেকেই তারা মাঠে ছুটে আসে—যা একাডেমির সফলতার অন্যতম দিক।
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন:
প্রথমে ছোট পরিসরে শুরু হলেও ব্যাপক সাড়া পেয়ে এখন বড় স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তা আব্দুর সবুর খান স্বপন। ভবিষ্যতে একটি নিজস্ব জায়গায় পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া একাডেমি কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
তিনি বিশ্বাস করেন, এই উদ্যোগ শুধু সাভার নয়, পুরো দেশের জন্যই একদিন গর্বের জায়গা হয়ে উঠবে।
শেষ কথা:
ডিজিটাল আসক্তির এই সময়ে, যেখানে শিশুদের শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে স্ক্রিনের আড়ালে—সেখানে Elite Sports Academy যেন এক টুকরো আশার আলো। খেলাধুলার মাধ্যমে সুস্থ, সচেতন ও স্বপ্নবান প্রজন্ম গড়ার এই প্রয়াস নিঃসন্দেহে একটি অনুকরণীয় উদ্যোগ।








Leave a Reply