
থেকে: সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে বৈরী আবহাওয়া ও সমুদ্রে ৪ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত থাকায় চরফ্যাশন উপজেলার ২০টি মৎস্যঘাটে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরেছে উপকূলীয় এলাকার শত শত মাছ ধরার ট্রলার। উত্তাল সাগর ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সাগরে যেতে পারছে না শতশত জেলে।
চরফ্যাশন উপজেলার বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র সামরাজ মৎস্যঘাটে গিয়ে দেখা যায়, শত শত ট্রলার নোঙর করে রাখা হয়েছে। আষাঢ়ে ইলিশের ভরা মৌসুম হলেও টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ ও বাতাসের গতিবেগে নদী ও সাগরে উত্তাল ঢেউয়ের সৃষ্টি হওয়ায় উপজেলার মৎস্যঘাটগুলোতে মাছের সরবরাহ প্রায় বন্ধ রয়েছে। ফলে মাছ ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ঘাটশ্রমিকরা প্রায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
ঘাটের জেলেদের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, গত ১১ জুন ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর নতুন আশায় সাগরে মাছ ধরতে নামেন তারা। কিন্তু প্রত্যাশিত ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ না পাওয়ায় অধিকাংশ ট্রলার মালিক লোকসানের মুখে পড়েছে। অনেক জেলেই ঋণ করে আবার সাগরে গেলেও নিন্মচাপ বা বৈরি আবহাওয়ায় সাগর উত্তাল হয়ে ওঠায় দুই-তিন দিনের মধ্যেই নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হন জেলেরা।
বেতুয়া নতুন স্লুইসগেট মৎস্যঘাটের ট্রলার মালিক হযরত আলী বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে দুই দফা সাগরে গিয়ে লোকসান গুনতে হয়েছে। পরে ঋণ করে আবার মাছ ধরতে গেলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে দ্রুত ফিরে আসতে হয়েছে। নতুন করে সতর্ক সংকেত জারি হওয়ায় জেলে ও ট্রলার মালিকদের অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
ট্রলার এফবি মায়ের দোয়া-এর মাঝি কামাল বলেন, “সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে ট্রলারে প্রচুর রোলিং হয়। বাতাসের গতি বেশি হওয়ায় ট্রলার নিয়ে এক যায়গায় দারিয়ে থাকা সম্ভব হয় না। মাঝ সাগরে অবস্থান করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা ট্রলার নিয়ে ঘাটে ফিরে এসেছি।”
হাজারিগঞ্জ ইউনিয়নে অবস্থিত মাইনুদ্দিন মৎস্যঘাটের মাঝি ওয়াদুদ জানান,অধিকাংশ ট্রলার নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে এসেছে। গভীর সমুদ্রে থাকা আরও কিছু ট্রলার এখনও ফেরার পথে রয়েছে। একই এলাকার জেলে সজীব শাহ্ বলেন, গভীর সমুদ্রে রেডিও বেতার বা মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় মাঝেমধ্যে জেলেরা সময়মতো সতর্কবার্তা পান না এবং দুর্যোগের মুখে পড়ে ট্রলারডুবি ও নিখোঁজের মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন।
নুরাবাদ গাছিরখাল মৎস্যঘাটের ট্রলারের মাঝি আবুল মনসুর বলেন, সাগরে আকস্মিক ঝড় ও ঢেউয়ের কবলে পড়ে ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটছে, অনেক সময় পার্শ্ববর্তী ট্রলারের সহায়তায় জেলেদের উদ্ধার করা গেলেও নিরাপদ সরঞ্জাম বা লাইফ বয়া অথবা লাইফ জ্যাকেট না থাকায় অনেকে নিখোঁজ থাকছেন। তিনি আরও বলেন,লক্ষ্য করা গিয়েছে কয়েক বছর ধরে ঘন ঘন নিম্নচাপ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আমাদের জেলেরা নিয়মিত সাগরে যেতে পারছেন না। ফলে বিপুল বিনিয়োগ করেও জেলে ও ট্রলার মালিকরা মোটা অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়ছেন।
বেসরকারি এনজিও সংস্থার মৎস্য বিশেষজ্ঞ উপজেলার সাবেক মেরিন ফিসারিস অফিসার সাইদুর রহমান বলেন, রেডিও তরঙ্গ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক সোজা পথে (লাইন-অফ-সাইটে) চলাচল করে। পৃথিবীর বক্রতার কারণে নির্দিষ্ট দূরত্বের পর টাওয়ারের সিগন্যাল মাটির সমান্তরালে চলে যায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, ফলে মাঝসমুদ্রে কোনো সিগন্যাল পাওয়া যায় না। তিনি বলেন,জাহাজ বা নৌকার মধ্যে যোগাযোগের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ভিএইচএফ রেডিও ব্যবহৃত হয়, যা উপকূলীয় স্টেশন বা অন্যান্য জাহাজের সাথে যোগাযোগ করতে সাহায্য করে।
চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে শত শত ট্রলার ও হাজারো জেলে নিরাপদ আশ্রয়ে ঘাটে ফিরে এসেছে। জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত কাউকে সাগরে যেতে সতর্ক করা হচ্ছে। কারণ নির্দিষ্ট সময়ে উপকূলে ফিরে না আসলে দুর্যোগের মুখে পড়ে ট্রলারডুবি ও নিখোঁজের মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয় জেলেরা।
চরফ্যাশন উপজেলা প্রশাসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, বর্তমানে সমুদ্রে ঢেউয়ের উচ্চতা প্রায় ১২ থেকে ১৮ ফুট পর্যন্ত ওঠানামা করছে এবং ৪ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরবর্তী নির্দেশনা ও সমুদ্রে চলাচলের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত কোনো ট্রলার বা নৌযানকে মাছ ধরা কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে সমুদ্রে না পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সমুদ্রে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বৈরী আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়বে। আবহাওয়ার এই বিরূপ পরিস্থিতি আরও চার থেকে পাঁচ দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ।
ছবি: চরফ্যাশন উপজেলার সামরাজ মৎস্যঘাটে নিরাপদ আশ্রয়ে জেলেদের ট্রলার। ঘরবন্দি জেলেরা অবসরে জাল সংস্কারে ব্যস্ত সময় পার করছেন।


Leave a Reply