
সাভার উপজেলার ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে ট্রেড লাইসেন্স ও বিভিন্ন নাগরিক সেবা বাবদ অর্থ আদায়, রাজস্ব হিসাবের গরমিল, অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব অভিযোগ তুলে ধরে ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব আদায়ের নথি, ট্রেড লাইসেন্স, ভাউচার ও সরকারি হিসাবে জমা দেওয়া অর্থের মধ্যে অসঙ্গতি থাকার দাবি করা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট মূল নথি, রাজস্ব রেজিস্টার, ব্যাংক হিসাব ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ পরিশোধের রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।
৯০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ, সরকারি হিসাবে ৫,২৩০ টাকা
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আশুলিয়ার জিরাবো এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে ওই অর্থের বিপরীতে সরকারি হিসাবে ৫ হাজার ২৩০ টাকা জমা দেখানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ নিয়ে অবশিষ্ট অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ওই অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের সিল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বাক্ষরযুক্ত একটি ভাউচার ব্যবহার করা হয়েছিল।
তবে একই বিষয়ে ২ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত আরেকটি অনলাইন প্রতিবেদনে আদায়ের পরিমাণ ৮০ হাজার টাকা এবং সরকারি হিসাবে জমার পরিমাণ ১০ হাজার ২৩০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত আদায়ের পরিমাণ ও সরকারি হিসাবে জমার অঙ্ক নিয়ে তথ্যগত অমিল রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে মূল ভাউচার, রসিদ, রাজস্ব রেজিস্টার ও ব্যাংক জমার হিসাব যাচাই করা জরুরি।
▪️ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে কর নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন
জিরাবো এলাকার ‘আনায়া সোয়েটার লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রেও অর্থ আদায় ও রাজস্ব হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির আয়তন ৮ হাজার বর্গফুট উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এর বিপরীতে সরকারি হিসাবে ৫ শতাংশ হারে বাণিজ্যিক কর বাবদ ৫ হাজার ২৩০ টাকা রাজস্ব দেখানোর দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ট্রেড লাইসেন্সের বার্ষিক ফি ২০০ টাকা এবং ভ্যাট বাবদ ৩০ টাকা উল্লেখ থাকার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ফলে আদায়কৃত অর্থের সঙ্গে সরকারি হিসাবে জমা দেখানো অর্থের পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
▪️‘কিন এক্সেসরিজ’-এর ক্ষেত্রেও গরমিলের অভিযোগ
জিরাবো এলাকার গার্মেন্টস-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ‘কিন এক্সেসরিজ’-এর ট্রেড লাইসেন্স নবায়নেও অর্থ আদায় ও রাজস্ব হিসাবে অসঙ্গতির অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও সরকারি হিসাবে ১০ হাজার ২৩০ টাকার রসিদ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্সের বার্ষিক ফি ও ভ্যাটের হিসাবও উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দুটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব মিলিয়ে ৬৪ হাজার ৫৪০ টাকা অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অঙ্কের যথার্থতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অর্থ পরিশোধের প্রমাণ, ইউনিয়ন পরিষদের মূল রসিদ, ভাউচার ও রাজস্ব রেজিস্টার যাচাই করা প্রয়োজন।
▪️‘হোমস্টেড ট্যাক্স’ উল্লেখ নিয়েও প্রশ্ন
‘ভার্চুয়াল বটমস লিমিটেড’-এর ট্রেড লাইসেন্সসংক্রান্ত একটি নথি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা আদায়ের একটি রসিদে অর্থ আদায়ের খাত হিসেবে ‘ভূমি কর’ বা ‘হোমস্টেড ট্যাক্স’-জাতীয় উল্লেখ রয়েছে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সসংক্রান্ত আদায়ের সঙ্গে এ ধরনের খাতের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
একই নথিতে ৯০ হাজার টাকা আদায়ের বিপরীতে ৫ হাজার ২৩০ টাকা সরকারি হিসাবে জমা দেখানোর কথা উল্লেখ থাকায় বাকি অর্থের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছে।
▪️নাগরিক সেবায় অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ
ট্রেড লাইসেন্স ও কর আদায়ের পাশাপাশি জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশান সনদ ও নাগরিকত্ব সনদসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, অতিরিক্ত অর্থ না দিলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেবা পেতে হয়রানির শিকার হতে হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও স্বতন্ত্র প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট সেবাগ্রহীতাদের বক্তব্য এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
▪️ব্যক্তিগত চালকের নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ
প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে তার ব্যক্তিগত চালক মো. মোফাজ্জল হোসেনের নামে ‘এবি বিল্ডার্স’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স তৈরি করে ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্স নম্বর ও জামগড়া, জিরাবো, আশুলিয়ার ঠিকানা উল্লেখ থাকার কথা বলা হয়েছে।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, ট্রেড লাইসেন্সের মূল রেকর্ড, ইউনিয়ন পরিষদের প্রকল্পসংক্রান্ত নথি, কার্যাদেশ এবং অর্থ পরিশোধের তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো স্বার্থের সংঘাত ঘটেছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
▪️পূর্ণাঙ্গ অডিট ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব আদায় নিয়ে ২ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের পূর্ণাঙ্গ অডিট এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র জানতে ট্রেড লাইসেন্স রেজিস্টার, ভাউচার, রাজস্ব রেজিস্টার, সরকারি রসিদ, ব্যাংক হিসাবে জমা, অনলাইন রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ পরিশোধের তথ্য একসঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
▪️অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য
অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আফজাল হোসেনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে তার বক্তব্য পাওয়া গেছে—এমন কোনো তথ্য বর্তমানে সাভারের খবরের কাছে নেই।
ফলে প্রতিবেদনে উত্থাপিত বিষয়গুলোকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃপক্ষ কিংবা অন্য কোনো পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
▪️তদন্তেই মিলতে পারে প্রকৃত হিসাব
ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব আদায় নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ পরিশোধের রেকর্ড, ইউনিয়ন পরিষদের মূল রসিদ ও ভাউচার, ট্রেড লাইসেন্স রেজিস্টার, রাজস্ব রেজিস্টার এবং ব্যাংকে জমা দেওয়া অর্থের হিসাব পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
অভিযোগগুলো সত্য হলে সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। আর অভিযোগের কোনো অংশ তথ্যভিত্তিক না হলে নিরপেক্ষ যাচাইয়ের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
Leave a Reply