




হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ, সংকটে রক্ত ও প্লাটিলেট—মেম্বার, কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান, মেয়র পদপ্রার্থী থেকে শুরু করে যুবসমাজ ও ছাত্রনেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান।
সাভারে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ, বাড়ছে স্বজনদের উদ্বেগ ও চিকিৎসাব্যয়ের বোঝা। এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগীদের প্রয়োজনীয় রক্ত ও প্লাটিলেট সময়মতো সংগ্রহ করতে অনেক পরিবারকে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংকটের মুহূর্তে প্রয়োজনীয় রক্ত ও প্লাটিলেট না পাওয়া রোগী ও স্বজনদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ২২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত সেপ্টেম্বর মাসে এই হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৭৩ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। অন্যদিকে, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় ৮০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, গত এক মাসে সেখানে প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার রোগী ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়েছেন।
▪️প্রশ্ন একটাই—এই সংকটের সময়ে সাভারবাসীর পাশে কে?
ডেঙ্গু কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জনপ্রিয়তা প্রদর্শনের ক্ষেত্রও নয়। এটি মানুষের জীবন ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন। তাই সাভারের যেসব মেম্বার, কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও মেয়র পদপ্রার্থী ভবিষ্যতে জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার প্রত্যাশা করছেন, তাদের প্রতিও এখন মানুষের প্রত্যাশা—শুধু নির্বাচনের সময় নয়, দুর্যোগের সময়ও মানুষের পাশে দাঁড়ান।
একই সঙ্গে সাভারের যুবসমাজ, ছাত্রনেতা, সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবকদেরও সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসার সময় এখনই।
কারণ একজন ডেঙ্গু রোগীর জন্য সময়মতো রক্ত কিংবা প্রয়োজনীয় প্লাটিলেটের ব্যবস্থা করা অনেক সময় কেবল একটি মানবিক সহায়তা নয়—এটি একটি পরিবারের জন্য চরম সংকটের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানো।
▪️রক্ত ও প্লাটিলেটের জন্য যেন স্বজনদের দ্বারে দ্বারে ছুটতে না হয়
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত বা প্লাটিলেটের প্রয়োজন হলে অনেক পরিবারকে দ্রুত ডোনার খুঁজতে ছুটতে হয়। জরুরি সময়ে পরিচিতজন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে রক্তদাতা সংগ্রহ করতে গিয়ে রোগীর স্বজনদের বাড়তি মানসিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
এ অবস্থায় স্থানীয়ভাবে একটি সমন্বিত রক্তদাতা ও প্লাটিলেট ডোনার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে। মেম্বার, কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও মেয়র পদপ্রার্থী, যুবসমাজ, ছাত্রনেতা এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো চাইলে নিজেদের এলাকার রক্তদাতাদের একটি স্বেচ্ছাসেবী তালিকা তৈরি করে জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতাল ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারেন।
তবে রক্ত বা প্লাটিলেট দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ, রক্তের গ্রুপের সামঞ্জস্য এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল/ব্লাড ব্যাংকের নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
▪️শুধু লিফলেট নয়, মাঠে চাই কার্যকর উদ্যোগ
মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা, ডেঙ্গুর প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা, রক্তদাতা নেটওয়ার্ক তৈরি এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়—এসব কাজে স্থানীয় নেতৃত্বের দৃশ্যমান ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।
শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক পোস্ট, ব্যানার কিংবা সভা-সমাবেশ নয়—মানুষ এখন মাঠে কার্যকর কাজ দেখতে চায়।
যারা আগামী দিনে মেম্বার, কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান কিংবা মেয়র হতে চান, তাদের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। একইভাবে ছাত্রনেতা ও যুবসমাজের কাছেও প্রত্যাশা—রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবী শক্তিকে সংগঠিত করুন।
মানুষ ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি শোনে; কিন্তু দুর্যোগের সময়ে মানুষ কাজ দেখতে চায়।
আজ যে পরিবারটি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বারান্দায় উদ্বিগ্নভাবে বসে আছে, আগামীকাল সেই পরিবারটি আমাদের কারও হতে পারে। আজ যে বাবা সন্তানের জন্য রক্ত খুঁজছেন, যে মা সন্তানের চিকিৎসার জন্য দুশ্চিন্তায় রাত কাটাচ্ছেন—তাদের কাছে পদ-পদবি নয়, প্রয়োজন সময়মতো চিকিৎসা, রক্ত, প্লাটিলেট এবং মানবিক সহায়তা।
সাভারের ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর চাপ সামলাতে সমস্যা তৈরি হলে বিষয়টি শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের একার দায়িত্ব হয়ে থাকতে পারে না। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ব্যবসায়ী সমাজ, যুবসমাজ, ছাত্রসমাজ, সামাজিক সংগঠন ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
▪️সাভারবাসীর কাছে আজকের প্রশ্ন???
ডেঙ্গুর এই দুর্যোগে আপনি কোথায়?
যারা জনগণের প্রতিনিধি হতে চান—আজ মানুষের পাশে দাঁড়ান।
যারা নেতৃত্ব দিতে চান—আজ নেতৃত্বের প্রমাণ দিন।
যারা ছাত্র ও যুবসমাজের নেতৃত্ব দেন—আজ মানবিক কাজে তরুণদের সংগঠিত করুন।
আর যারা জনপ্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন—পদ পাওয়ার আগে মানুষের জন্য কাজ করার দৃষ্টান্ত তৈরি করুন।
কারণ পদ মানুষকে বড় করে না; মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর কাজই একজন নেতাকে বড় করে।
▪️সাভারবাসীর প্রতি আহ্বান
বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রেন, ডোবা কিংবা আশপাশের যেকোনো স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করুন। নিজের পরিবারকে সচেতন করার পাশাপাশি প্রতিবেশীকেও সচেতন করুন। ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আর কোনো ডেঙ্গু রোগীর রক্ত বা প্লাটিলেট প্রয়োজন হলে যাচাই-বাছাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়িয়ে না দিয়ে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী রক্তদাতা সংগ্রহে সহযোগিতা করুন।
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সরকারের নয়—এটি পুরো সাভারবাসীর সম্মিলিত দায়িত্ব।
আজ সময় রাজনীতির মাঠে নিজের পরিচয় জানানোর নয়; মানুষের দুঃসময়ে মানবিকতার মাঠে নিজের অবস্থান জানানোর।
Leave a Reply