
ঢাকার সাভারের রাজাসন এলাকার একজন সুপরিচিত শিক্ষা উদ্যোক্তা জনাব আশরাফ আলী। তার জীবনের গল্প শুধুমাত্র সফলতার নয়, বরং কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ।
২০০২ সালে মাত্র দুইজন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়ানোর মাধ্যমে তার পথচলা শুরু হয়। সে সময় মাসিক সম্মানী ছিল মাত্র ৩০০ টাকা। সীমিত আয়ের সেই সূচনা থেকেই তিনি পরিবারকে সহায়তা এবং নিজের পড়াশোনার খরচ বহন করতেন।
২০০৭ সালে শিক্ষার্থীদের বাড়তি আগ্রহ ও চাহিদার কারণে সাভারের রাজাসন এলাকায় একটি কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পাশেই অবস্থিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত টিউশনি করাতে আসতেন, ফলে প্রতিযোগিতা ছিল তীব্র। তবে নিজের দক্ষতা, আন্তরিকতা ও শিক্ষাদানের মানের কারণে তিনি ধীরে ধীরে অভিভাবকদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন।
কোচিং সেন্টারের সীমিত আয় দিয়েই পরিবার চালানো এবং নিজের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেওয়ার কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তিনি থেমে থাকেননি। বরং সেখান থেকেই বড় স্বপ্ন দেখার সাহস অর্জন করেন।
পরবর্তীতে কোচিং সেন্টারের সফলতা এবং অভিভাবকদের আস্থাকে পুঁজি করে ২০১৫ সালে ‘মুক্তির জন্য শিক্ষা’ স্লোগান নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন পার্ক ভিউ স্কুল এন্ড কলেজ। শুরুতে আশেপাশের কিছু প্রতিষ্ঠানের অবহেলা ও প্রতিযোগিতার কারণে তাকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হলেও, প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক ভালো ফলাফল ও মানসম্মত শিক্ষার কারণে দ্রুতই সেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
বর্তমানে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে এবং ৩১ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। শিক্ষকরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে নিজেদের হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন আশরাফ আলী।
জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তিনি দুইবার সরকারি চাকরিতে নির্বাচিত হলেও নিজের গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাননি। বরং শিক্ষা সেবাকেই নিজের জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ব পালনে সমানভাবে সক্রিয় তিনি। বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠন, স্থানীয় ক্লাব, খেলাধুলার আয়োজন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অনুদান প্রদান করেন। দেশের যেকোনো দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতেও তার সহায়তার হাত প্রসারিত থাকে। এসব মানবিক উদ্যোগের ফলে তিনি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন এবং একজন দায়িত্বশীল সমাজসেবক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন।
এছাড়াও তিনি নিয়মিত দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকেন, যা তার মানবিক গুণাবলির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন সবুর খান-কে, যিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-এর চেয়ারম্যান।
বর্তমানে রাজাসন এলাকার শীর্ষ তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্থান করে নেওয়া এই প্রতিষ্ঠানটিকে ভবিষ্যতে এক নম্বরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন তিনি। তার পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে এয়ার কন্ডিশনের ব্যবস্থা করা। ইতোমধ্যে পুরো প্রতিষ্ঠানটি সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে, রয়েছে অভিভাবকদের জন্য আলাদা বসার স্থান এবং নিয়মিত অভিভাবক-শিক্ষক সভার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের কার্যক্রম।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে আশরাফ আলীর বার্তা—“যে কাজই করো, সেটাতে পূর্ণ মনোযোগ ও আন্তরিকতা থাকতে হবে।”
তার প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। কেউ হয়েছেন ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, আবার কেউ সফল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
এছাড়া, নিজের প্রতিষ্ঠানের আয়ের মাধ্যমেই তিনি তার ছয় ভাই-বোনকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছেন, তাদের জীবিকা নিশ্চিত করেছেন এবং পারিবারিক দায়িত্বও সফলভাবে পালন করেছেন।
একজন সাধারণ প্রাইভেট টিউটর থেকে সফল শিক্ষা উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার এই গল্প নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে—সৎ ইচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম এবং ধৈর্য থাকলে সাফল্য একদিন ধরা দিতেই বাধ্য।







Leave a Reply