
পেট্রল ঢেলে শরীরে আগুন। প্রাণ বাঁচাতে পাশের জলাশয়ে ঝাঁপ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারলেন না ফরহাদ হোসেন।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় নির্মম এই হত্যাকাণ্ড যেন কোনো সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায়।
বুধবার রাত ১০টার দিকে মুক্তাগাছা পৌর শহরের মধ্যহিস্যা এলাকায় বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন ৩৫ বছর বয়সী ফরহাদ। কিছুক্ষণ পর পেছন থেকে দুর্বৃত্তরা তাঁর শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে শরীরে। জীবন বাঁচাতে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে পাশের একটি জলাশয়ে ঝাঁপ দেন ফরহাদ। তাঁর আর্তচিৎকার শুনে স্থানীয়রা ছুটে এসে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করেন। প্রথমে মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
ফরহাদ ছিলেন সবজি বিক্রেতা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। বেকারদের কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন। এমনকি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি প্রার্থী হওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই। কেন একজন মানুষকে পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করতে হবে?
পরিবারের দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয় একটি কুচক্রী মহলের সঙ্গে ফরহাদের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। নিহতের বাবা আব্দুস সাত্তার অভিযোগ করেছেন, মাদক কারবারিদের বিরোধিতার কারণেই তাঁর ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
তবে এটি পরিবারের অভিযোগ। পুলিশ এখনো হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা রয়েছে বা কী কারণে এই ঘটনা ঘটেছে, তা নিশ্চিত করেনি।
মুক্তাগাছায় এর আগেও মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন ও স্থানীয় পর্যায়ে অভিযান নিয়ে খবর এসেছে। গত জুলাইয়ে স্থানীয় মাদকবিরোধী কমিটির অভিযানে ১০ জনকে আটক করা হয়েছিল এবং পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।
সেই প্রেক্ষাপটে ফরহাদ হত্যার ঘটনাটি আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
কারণ মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলা অপরাধ নয়। সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অপরাধ নয়। কারও সঙ্গে বিরোধ থাকলেও বিচার করার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই।
একজন মানুষকে পেট্রল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার মতো ভয়াবহ অপরাধ যদি সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে শুধু হত্যাকারী নয়, এর পেছনে থাকা পরিকল্পনাকারী ও সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
ফরহাদ জলাশয়ে ঝাঁপ দিয়ে হয়তো শেষবারের মতো বাঁচতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে বাঁচানো গেল না। এখন অন্তত তাঁর মৃত্যুর রহস্য যেন অন্ধকারে থেকে না যায়।
পুলিশের তদন্তেই বেরিয়ে আসুক, কারা এই আগুন জ্বেলেছিল এবং কেন একজন মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারতে হলো।
Leave a Reply