
গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতেন চালকের বেশে। বিদেশ থেকে দেশে ফেরা ক্লান্ত প্রবাসীদের কাছে নিজেকে পরিচয় দিতেন নিরাপদ যাতায়াতের মানুষ হিসেবে। গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে গাড়িতে তুলতেন। এরপরই শুরু হতো আসল খেলা।
পুলিশের দাবি, গাড়িতে তোলার পর সুযোগ বুঝে প্রবাসীদের টাকা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান মালামাল ছিনিয়ে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নামিয়ে দিতেন আলামিন শেখ (৩১)। দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দর এলাকা ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের চুরি ও ছিনতাইয়ে জড়িত ছিলেন তিনি।
অবশেষে বৃহস্পতিবার বিকেলে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার পূর্ব মহারাজপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
গ্রেপ্তারের পর আলামিনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে যা পাওয়া গেছে, সেটিই এখন এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুলিশের তথ্যমতে, উদ্ধার করা হয়েছে ১৫টি অ্যান্ড্রয়েড ফোন, ৩টি আইফোন, ৪টি ট্যাব, ৭টি বাটন ফোন, ১০টি হাতঘড়ি, ১১টি মানিব্যাগ, বিভিন্ন দেশের ৭৭টি মুদ্রার নোট এবং নগদ ১ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। সঙ্গে পাওয়া গেছে একটি চায়নিজ কুড়াল ও দুটি সুইচ গিয়ার চাকু। তথ্যসূত্র দৈনিক প্রথম আলো
এতগুলো মোবাইল, বিভিন্ন দেশের মুদ্রা, ঘড়ি ও মানিব্যাগ কীভাবে তার কাছে এলো, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এসব আলামতের সঙ্গে আগের কোনো ছিনতাই বা চুরির ঘটনার যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার বিষয়।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আলামিন দীর্ঘদিন ধরে চুরি ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় ডাকাতি ও মাদকসহ ছয়টি মামলা রয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনাটি শুধু একজন ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারের খবর নয়। বিমানবন্দরে বিদেশ থেকে ফেরা একজন প্রবাসীকে টার্গেট করে কীভাবে আস্থা তৈরি করা হয়, সেটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
বছরের পর বছর বিদেশের মাটিতে পরিশ্রম করে একজন মানুষ দেশে ফেরেন। সঙ্গে থাকে কষ্টার্জিত টাকা, পরিবারের জন্য কেনাকাটা, কখনো বহুদিন পর প্রিয়জনদের কাছে ফেরার আনন্দ। বিমানবন্দরের বাইরে বের হওয়ার পর যদি সেই মানুষটিকেই ‘চালক’ পরিচয়ে কেউ টার্গেট করে, তাহলে সেটি শুধু অর্থের ক্ষতি নয়, দেশে ফেরার আনন্দের ওপরও বড় আঘাত।
তাই বিমানবন্দর থেকে গন্তব্যে যাওয়ার সময় অপরিচিত ব্যক্তির প্রস্তাবে গাড়িতে ওঠার আগে পরিচয় ও গাড়ির তথ্য যাচাই করা জরুরি। প্রয়োজনে অনুমোদিত পরিবহনসেবা বা পরিচিত স্বজনের সহায়তা নেওয়া উচিত।
আর পুলিশের জন্যও এই ঘটনার বড় প্রশ্ন হলো, বিমানবন্দরের বাইরে এমন চক্র কতদিন ধরে সক্রিয় এবং তাদের সঙ্গে আর কারা জড়িত?
একজন আলামিন ধরা পড়েছেন। কিন্তু যদি এটি একটি চক্র হয়ে থাকে, তাহলে তদন্তের আসল সাফল্য হবে সেই চক্রের পুরো নেটওয়ার্ক বের করে আনা।
পাশাপাশি একই দিনে মুকসুদপুরের হরিশ্চর এলাকায় পৃথক অভিযানে ৮০০ ইয়াবাসহ এক নারীকে গ্রেপ্তারের কথাও জানিয়েছে গোপালগঞ্জ ডিবি। পুলিশের হিসাবে উদ্ধার ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, গ্রেপ্তারের পর তদন্ত যেন শুধু উদ্ধার হওয়া মালামালেই থেমে না যায়। এসব মালামালের প্রকৃত মালিক কারা, কোথায় এবং কীভাবে ছিনতাই হয়েছে, আর কারা এই কাজে জড়িত, সেটিও বেরিয়ে আসা দরকার।
Leave a Reply