
সাভারের আমিনবাজারে একটি গাড়ি পার্কিংকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ হলো ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে। নিজের ছেলের পোশাক কারখানার ভেতরে ঢুকে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এসআই আলতাব হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন তাঁর ২৬ বছর বয়সী ছোট ছেলে আরিফুল ইসলাম।
শনিবার রাত ৮টার দিকে আমিনবাজারের বড়দেশি মদিনা সিটি এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। আলতাব হোসেন এসবির ঢাকার মালিবাগ জোনে উপপরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবার নিয়ে তিনি ওই এলাকাতেই বসবাস করতেন। ছেলেদের একটি ছোট পোশাক কারখানাও ছিল সেখানে।
পরিবারের ভাষ্য, কারখানার কাছাকাছি একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে এক বয়স্ক ব্যক্তিকে মারধর করতে দেখে আলতাব হোসেন সেখানে যান। গাড়ি পার্কিং বা সাইড দেওয়া-নেওয়াকে কেন্দ্র করে ওই ব্যক্তির সঙ্গে কয়েকজনের বিরোধ চলছিল। পরিস্থিতি থামানোর চেষ্টা করলে আলতাব নিজেও হামলার শিকার হন।
তিনি হামলাকারীদের জানান, তিনি পুলিশের সদস্য। কিন্তু তাতেও হামলা থামেনি। বরং তাঁকে চড় মারা হয় এবং কানে আঘাত লাগে। পরে তিনি দৌড়ে ছেলের কারখানায় ফিরে যান।
বিষয়টি জানতে পেরে ছোট ছেলে আরিফুল বাবার সঙ্গে বাইরে বের হন। এরই মধ্যে একটি সাদা প্রাইভেট কারসহ কয়েকজন সেখানে আসে। পরিবারের দাবি, পরে আরও লোকজন জড়ো হয়ে ২০ থেকে ২৫ জনের মতো একটি দল তৈরি হয়। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বাবা-ছেলে কারখানার ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করেন।
কিন্তু অভিযোগ, হামলাকারীরা দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে কারখানার ভেতরে ঢুকে পড়েন। প্রথমে আরিফুলকে মেঝেতে ফেলে বুকে লাথি মারা হয়। একপর্যায়ে পেছন থেকে ভারী কিছু দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করা হলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। একই সময় আলতাব হোসেনকেও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মারধর করা হয়।
পরে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে বাবা ও ছেলেকে উদ্ধার করেন। রাতের দিকে তাঁদের রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক আলতাব হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর ছেলে আরিফুলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কয়েকটি প্রতিবেদনে তাঁর অবস্থা গুরুতর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। নিহত এসআইয়ের পরিবারের অভিযোগ, একটি সাদা প্রাইভেট কারে চালকসহ কয়েকজন নিয়মিত ওই এলাকায় আসতেন এবং কারখানার পাশের একটি জায়গায় তাঁরা মাদক সেবন করতেন। তবে এই অভিযোগ এখনো তদন্তসাপেক্ষ। এটিকে ঘটনার প্রমাণিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সাভার মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল আলম জানিয়েছেন, আমিনবাজারের বড়দেশি এলাকায় একজন এসবি সদস্যকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে এবং মামলার প্রক্রিয়া চলছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটা এখানেই।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি দীর্ঘদিন রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন, নিজের বাসার কাছেই একটি তুচ্ছ বিরোধ থামাতে গিয়ে হামলার শিকার হলেন। পুলিশ পরিচয় দেওয়ার পরও হামলা থামেনি। শেষ পর্যন্ত নিজের ছেলের কারখানার ভেতরেই তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো।
একটি গাড়ি পার্কিং নিয়ে বিরোধ কীভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে গণপিটুনি এবং হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়, আমিনবাজারের এই ঘটনা তার ভয়াবহ উদাহরণ।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো, প্রকৃত ঘটনা কী ছিল, কারা হামলায় অংশ নিয়েছিল, কেন এত লোক সেখানে জড়ো হয়েছিল এবং হত্যার পেছনে পার্কিং বিরোধের বাইরে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করা।
আলতাব হোসেনের পরিবারের জন্য এটি শুধু একজন স্বজনকে হারানোর ঘটনা নয়। একজন বাবা নিহত হয়েছেন, তাঁর ছেলে হাসপাতালে লড়ছেন। আর একটি পরিবার অপেক্ষা করছে ন্যায়বিচারের জন্য।


Leave a Reply