
বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম সদস্য এডভোকেট মোঃ মোসলেম উদ্দিন আজ ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর মৃত্যুতে ময়মনসিংহের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সাবেক গণ পরিষদ সদস্য এবং ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়ীয়া) আসন থেকে পাঁচবার নির্বাচিত এই সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন এক জীবন্ত ইতিহাস।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। শনিবার ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি দুইছেলে, দুই মেয়ে, আত্মীয়-স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। উল্লেখ্য, তাঁর স্ত্রী কয়েক মাস আগে এবং এক ছেলে পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন।
একনজরে বীরমুক্তিযোদ্ধা ও সংবিধান প্রণেতা এবং ৬ বারের সাবেক এমপি জননেতা এড. মো. মোসলেম উদ্দিন:
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়:
দেশের অন্যতম প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ ১৯৩৯ সালের ৩০ জানুয়ারি ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়ীয়া উপজেলার নিউগী কুশমাইল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
শিক্ষা জীবন:
তিনি ১৯৫৪ সালে ফুলবাড়ীয়া এইচ. ই. স্কুল (বর্তমানে ফুলবাড়ীয়া সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। এরপর ১৯৫৭ সালে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৬০ সালে একই কলেজ থেকে বি.এ.পাশ করেন। তারপর উচ্চশিক্ষার ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৬৮ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বি.এড. এবং ১৯৬৯ সালে ঢাকা সেন্ট্রাল ল’কলেজ থেকে এল.এল.বি. ডিগ্রি লাভ করেন।
পেশাগত জীবন:
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ১৯৬০ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন পরবর্তীতে ১৯৭২ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং ময়মনসিংহের একজন প্রথিতযশা আইনজীবী হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি ২০০৫ সালে ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
রাজনৈতিক জীবন ও অর্জন:
এডভোকেট মোঃ মোসলেম উদ্দিনের রাজনৈতিক জীবন ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম ও সফলতার এক অনন্য ইতিহাস। রাজপথের লড়াই সংগ্রামের জন্য মামলা হামলা হুলিয়া নিয়েও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন কে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ভাষা আন্দোলন ও ছাত্র রাজনীতি:
ছাত্রবস্থায় তিনি রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনে ফুলবাড়ীয়া এইচ. ই. স্কুলের ছাত্রদের নেতৃত্ব দেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত মোঃ মোসলেম উদ্দিন ছাত্রলীগ ময়মনসিংহ জেলা শাখার একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন।
আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন:
১৯৬৩ সালে ভিজি মেম্বার নির্বাচিত হয়ে তিনি সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পদে ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
৬ দফা ও গণঅভ্যুত্থান:
বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ১৯৬৬-র ৬ দফার আন্দোলনে এবং ১৯৬৯-র গণঅভ্যুত্থানে তিনি ফুলবাড়ীয়ায় নেতৃত্ব দেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান প্রণয়ন:
তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সক্রিয় সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি এম.পি.এ. নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে তিনি জেলা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। ১৯৭২ সালে তিনি গণপরিষদের সদস্য মনোনীত হন এবং বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। হস্তলিখিত সংবিধানে ৪০৩ জন সদস্যের মধ্যে ২৮৩ নং ক্রমিকে তাঁর স্বাক্ষর রয়েছে।
সংসদীয় রাজনীতি:
তিনি ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১,২০০১ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
সংসদীয় দায়িত্ব:
৮ম জাতীয় সংসদে তিনি সরকারী প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়, বস্ত্র মন্ত্রণালয় এবং সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি “বাংলাদেশ-সৌদি আরব সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপ”-এর সদস্য ছিলেন।
দলীয় নেতৃত্ব:
১৯৭০ সালে তিনি ফুলবাড়ীয়া থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন এবং ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৭৯ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত টানা চার দশকেরও বেশি সময় তিনি ফুলবাড়ীয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ও কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন।
সংকটকালীন ভূমিকা:
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর এবং ৩রা নভেম্বর জেলখানায় জাতীয় চার নেতা হত্যার পর আওয়ামী লীগের অত্যন্ত কঠিন সময়ে তিনি ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তাঁর ময়মনসিংহ শহরের ছোটবাজারস্থ বাসভবন থেকেই সে সময় ময়মনসিংহে আওয়ামী লীগের ঘরোয়া রাজনীতির পুর্ণজাগরণ ঘটেছিল।
সামাজিক ও শিক্ষামূলক অবদান:
তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষানুরাগী ছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ও পৃষ্ঠপোষকতা করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:-
১.বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা মহাবিদ্যালয়, ফুলবাড়ীয়া (প্রতিষ্ঠাতা)
২.ফুলবাড়ীয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ (অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা)
৩.কেশরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ (অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা)
৪.ফুলবাড়ীয়া পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা) এছাড়াও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
এডভোকেট মোঃ মোসলেম উদ্দিন ফুলবাড়ীয়া উপজেলার মানুষের কাছে ছিলেন অত্যন্ত প্রিয় আস্থাভাজন ও ভরসার স্থল। একজন বিনয়ী সমাজসেবক, দক্ষ আইনজীবী এবং নিষ্ঠাবান রাজনীতিক হিসেবে তিনি যুগ যুগ ধরে মানুষের স্মৃতিতে অম্লান থাকবেন।
তার মৃত্যুতে ফুলবাড়িয়া সহ ময়মনসিংহ বিভাগে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
Leave a Reply