
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০৫ (সংশোধিত ২০২৬) এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রেজা মো. গোলাম মাসুম প্রধান।
তিনি বলেন, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম বড় হুমকি। তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া এবং উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে জাতীয় অর্থনীতিও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
গতকাল বুধবার (২৯ জুলাই) দুপুর ১২টায় ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বাংলাদেশ জাতীয় যক্ষ্মা নিরোধ সমিতি (নাটাব) ময়মনসিংহ জেলা শাখার আয়োজনে অনুষ্ঠিত “ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০৫ (সংশোধিত ২০২৬) এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়নে স্টেকহোল্ডারদের ভূমিকা জোরদারকরণ” শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. আসাদুজ্জামান।
প্রধান অতিথি রেজা মো. গোলাম মাসুম প্রধান আরও বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন শুধু প্রশাসনের একক দায়িত্ব নয়। এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। আইন বাস্তবায়নের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করতে পারলে তামাকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, “পাবলিক প্লেসে ধূমপান, তামাকজাত দ্রব্যের অবৈধ বিজ্ঞাপন কিংবা আইন লঙ্ঘনের ঘটনা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না। নিয়মিত তদারকি, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে একটি তামাকমুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।”
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নাটাবের প্রজেক্ট ম্যানেজার মো. ফিরোজ আহমদ। তিনি ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০৫ (সংশোধিত ২০২৬), সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, আইনের বিভিন্ন ধারা, সংশোধিত বিধান, মাঠপর্যায়ে আইন বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতা এবং বাস্তবায়নে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত উপস্থাপনা করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধারা সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধিত আইনে পাবলিক স্থানে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, প্রচার ও প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতা আরও সুস্পষ্ট করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, তামাকজাত পণ্যের প্যাকেট ও মোড়কে নির্ধারিত স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা, ক্ষতিকর দিক নির্দেশক ছবি এবং প্রয়োজনীয় তথ্য বাংলায় স্পষ্টভাবে মুদ্রণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইন অমান্য করলে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা, কারাদণ্ড এবং প্রয়োজনবোধে লাইসেন্স বাতিলসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।
অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন নাটাবের প্রোগ্রাম অফিসার মো. রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত সরকারি কর্মকর্তারা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। তারা জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, বাজার তদারকি জোরদার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিসে ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা তথ্য অফিসের পরিচালক মীর আকরাম উদ্দীন জায়েদ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
মতবিনিময় সভা শেষে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তারা জেলা প্রশাসক কার্যালয় চত্বরে গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এ সময় তারা প্রকাশ্যে ধূমপানকারীদের ধূমপান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান এবং আশপাশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে তামাকজাত পণ্যের বিক্রি, প্রদর্শন ও প্রচারের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন মেনে চলার অনুরোধ জানান।
বক্তারা বলেন, তামাকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; এর যথাযথ বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি সুস্থ, নিরাপদ ও তামাকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
Leave a Reply