


এআর সোয়েব চৌধুরী, চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি: ইলিশের প্রজনন রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ভোলার চরফ্যাশনের সামরাজ উপকূলের কিছু মাছ ধরার ট্রলার গভীর সাগরে অবস্থান করে ইলিশ শিকার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিষেধাজ্ঞা শেষে ঘাটে ফেরা কয়েকটি ট্রলারের মাছ পচে যাওয়ার ঘটনায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন সাগরে অবস্থান করায় ট্রলারে সংরক্ষিত বরফ শেষ হয়ে যায়। কিছু ইলিশ লবণ দিয়ে সংরক্ষণের চেষ্টা করা হলেও বিপুল পরিমাণ মাছ পচে নষ্ট হয়। পরে পচা মাছের কিছু অংশ সামরাজ মৎস্যঘাটের নদীতীরে ফেলে দেওয়া হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সম্প্রতি সামরাজ মৎস্যঘাটের নদীতীরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায় পচা মাছ। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন সাগরে অবস্থান করা কয়েকটি ট্রলারের বরফ শেষ হয়ে যাওয়ায় মাছ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। এতে জেলেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পাশাপাশি নদীতীরে পচা মাছ ফেলে দেওয়ায় দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, কয়েকটি ট্রলার দীর্ঘদিন গভীর সাগরে অবস্থান করে মাছ শিকার করেছে। ট্রলারগুলো অবরোধের শুরু থেকে প্রায় ২২দিন সাগরে অবস্থান করেছে। রাতের আঁধারে খুলনা থেকে আনা (চিংড়ির বরফ) হাজারীগঞ্জ মাইনুদ্দিন ঘাট থেকে সাগরে নিয়ে ওইসব ট্রলারে সরবরাহ করার তথ্য পাওয়া গেছে।
জেলেদের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় সাগরে অবস্থান করায় ট্রলারে থাকা বরফ শেষ হয়ে যায়। পরে কিছু ইলিশে লবণ দিয়ে সংরক্ষণের চেষ্টা করা হলেও অনেক মাছ পচে যায়। শেষ পর্যন্ত এসব মাছের কিছু অংশ ঘাটে ফেলে দিতে হয়েছে।
স্থানীয় শিক্ষক কালাম শিকদার বলেন, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ট্রলারগুলো কীভাবে মাছ শিকার করেছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে মাছ ধরতে যাওয়ার বিষয়টি আলাদাভাবে যাচাই করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সংশ্লিষ্ট জেলে আব্দুল মোতালেব বলেন, দীর্ঘদিন সাগরে অবস্থান করায় ট্রলারের বরফ শেষ হয়ে যায়। মাছ সংরক্ষণ করতে না পেরে বিপাকে পড়ি। কিছু মাছ লবণ দিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু অনেক মাছ পচে যাওয়ায় সেগুলো বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। এতে আমাদের বড় ধরনের লোকসান হয়েছে। আরেক জেলে আবুল হাসেম বলেন, দীর্ঘ সময় সাগরে থাকায় বরফ শেষ হয়ে মাছ নষ্ট হয়েছে। আমরা নিষেধাজ্ঞার শুরুতে কয়েক লাখ টাকার সদাই করে সাগরে গিয়েছি। চলে আসলে আমাদের লোকসান হওয়া ও গ্রেফতারের ভয়ে সাগরে কিছুদিন মাছ ধরেছি। এরপর একটি চরে কিছুদিন অবস্থান করে কিছু বরফ আনার চেষ্টা করি ওই বরফগুলো সাংবাদিক ও মৎস্য অফিসের লোকেরা আটক করে। পরে সেই বরফ ধ্বংস করে দিলে মাছগুলো নষ্ট হয়ে পচে যায়।
মাঝি আবদুল মজিদ বলেন,দীর্ঘদিন সাগরে অবস্থান করায় ট্রলারে সংরক্ষিত বরফ শেষ হয়ে যাওয়ায় মাছ সতেজ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু ইলিশ লবণ দিয়ে সংরক্ষণের চেষ্টা করা হলেও সব মাছ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। পচে যাওয়া মাছ বিক্রির অনুপযোগী হওয়ায় জেলেদের জ্বালানি, বরফ, খাবার ও শ্রমের খরচও ওঠেনি।
চর মানিকা দক্ষিণ জোন কোস্টগার্ডের কন্টনজেন্ট কমান্ডার খন্দকার খলিল বলেন, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নদী ও সাগরে টহল এবং অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো ট্রলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ আহরণ সরকারি নির্দেশনার লঙ্ঘন। কোনো ট্রলার এ সময় অবৈধভাবে মাছ শিকার করে থাকলে অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেসব বোট ঘাটে পচা মাছ নিয়ে এসেছে সেগুলো চরফ্যাশনের বোট না। এ বোটগুলো অন্য জেলা থেকে মাছ বিক্রি করতে এসেছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আরও জানান, অভিযানে ১৩টি মোবাইল কোর্ট, ৭৪টি অভিযান পরিচালনা করে ২লক্ষ ৭১হাজার ৫শ মিটার জাল আটক করা হয়েছে যার মূল্য প্রায় ৯৪লাখ ৭৫ হাজার টাক। একই সাথে ৩২টি মামলা হয়েছে। আটক করা হয়েছে ৫১জনকে এবং ১লক্ষ ২৭হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ৮জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারদণ্ডের পাশাপাশি নিয়মিত মামলা করা হয় ২টি এবং ১৫শ ক্যান বরফ ধ্বংস করে দেয়া হয়। আটককৃত ৯টি ছোট নৌকা নিলামে দিয়ে ৩৪হাজার ৭শ টাকা সরকারী কোষাগারে জমা দেয়া হয়েছে।
পরিবেশ কর্মী তৌকিদ সাব্বির বলেন,মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ শিকার বন্ধ রাখার উদ্দেশ্য হলো ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেয়া এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদন রক্ষা করা। নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ শিকার হয়ে থাকলে তা প্রজনন সুরক্ষার উদ্যোগকে ব্যাহত করতে পারে।
Leave a Reply