
একটা সময় ছিল, যখন পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল ঢাকায় রোদের তাপে পুড়ে যাওয়া, রমনায় গান, আর চারুকলার সেই বিখ্যাত শোভাযাত্রা— যেখানে হাতি, ঘোড়া, পাখি, মাছ— সবাই মিলেমিশে এক অদ্ভুত রঙিন গণতন্ত্র চালাতো। সেখানে কেউ কারও ধর্ম জিজ্ঞেস করতো না, কেউ কারও বিশ্বাস যাচাই করতো না। সবাই শুধু জানতো— আজ নববর্ষ, আজ মানুষের দিন, আজ ‘মঙ্গল’ হোক।
কিন্তু হায়! সেই ‘মঙ্গল’ই এখন জাতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের অর্থনীতি, বেকারত্ব, শিক্ষা— এসব তো ছোটখাটো ব্যাপার। আসল বিপদ লুকিয়ে ছিল ‘মঙ্গল’ শব্দের মধ্যে! এতদিন আমরা বুঝতেই পারিনি— এই শব্দটা কত ভয়ংকর, কত বিপজ্জনক, কত ষড়যন্ত্রে ভরা!
একদল ‘জ্ঞানী’ মানুষ হঠাৎ করে আবিষ্কার করলেন— ‘মঙ্গল’ শব্দটা নাকি সাম্প্রদায়িক। শুনে মনে হয়, শব্দটা বোধহয় রাতে গোপনে বৈঠক করে, ষড়যন্ত্র করে, তারপর ভোরে উঠে মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়,আদর্শ পরিবর্তন করে দেয়, কী সাংঘাতিক ক্ষমতা!
শুরুটা হয়েছিল ডক্টর মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। তারা অত্যন্ত সুশীল কায়দায় ‘মঙ্গল’ শব্দটাকে ডিলিট চেপে ‘আনন্দ’ বসিয়ে দিয়েছিলেন।
এরপর ক্ষমতার পালাবদল হলো, বিএনপি সরকার এলো। তারা প্রথমে বললো, ‘মঙ্গল’ শব্দটি ফিরিয়ে আনা হবে।
এটা শুনে রাজপথে একদল হুঙ্কার দিলেন, ‘মঙ্গল’ সরিয়ে ‘আনন্দ’ করা হয়েছে, অনেক সাধনায়। এখন যদি আবার ‘মঙ্গল’ ফিরিয়ে আনা হয়, তাহলে কিন্তু সব কিছু ‘ওলটপালট” করে দেওয়া হবে।
এসব দেখেশুনে বিএনপিওয়ালারা ‘মধ্যপন্থি’ অবস্থান নিলেন। তারা বললেন, আনন্দও নয়, মঙ্গলও নয়, নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা।
কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে যায়—সংস্কৃতি কি শুধু শব্দে থাকে? নাকি মানুষের চেতনায়? যদি চেতনায় থাকে, তাহলে শব্দ বদলালেই কি সেটা বদলে যায়? আর যদি শব্দেই থাকে, তাহলে তো পুরো ভাষাটাই বদলাতে হবে!
বর্তমানে মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর Representative List of the Intangible Cultural Heritage of Humanity-তে ‘Mangal Shobhajatra on Pahela Baishakh’ নামেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
Leave a Reply