
সাভারে মাদক কেনাবেচার ধরন বদলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় অলিগলি, আবাসিক এলাকা ও বিভিন্ন সড়কের পাশের দোকানের পাশাপাশি চলন্ত রিকশাকেও মাদক সরবরাহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যাত্রীবেশে ক্রেতারা রিকশায় ওঠার পর চলন্ত অবস্থায় মাদক হাতবদল করার অভিযোগও রয়েছে।
দৈনিক ইনকিলাবের ৫ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাভারের বিভিন্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচায় এমন একটি ‘ভাসমান’ পদ্ধতি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। একই প্রতিবেদনে আবাসিক এলাকা, শপিংমল, পাড়া-মহল্লা ও সড়কের পাশের টং দোকানকে মাদক বেচাকেনার স্থান হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, মাদক সরবরাহ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত চক্রগুলো ছোট ছোট বিক্রেতার মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা চক্রের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে প্রমাণিত তথ্য এবং তাদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
▪️আলতাব হত্যাকাণ্ড ঘিরে মাদক প্রসঙ্গ
সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আলতাব হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনাও এলাকায় মাদক ও অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে বড়দেশি এলাকায় হামলার শিকার হয়ে নিহত হন আলতাব হোসেন। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে হামলার সূত্রপাত ও ঘটনার বর্ণনায় কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। পুলিশ ও র্যাবের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি গাড়ি/অটোরিকশা রাখা এবং তা নিয়ে বিরোধের জেরে ঘটনাটির সূত্রপাত হয়। অন্যদিকে নিহতের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় কয়েকজনের বক্তব্যে হামলাকারীদের মাদকসেবনের বিষয়টি উঠে আসে।
এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে এবং একাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি জহুরুলকে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠান।
তবে র্যাব ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফলে আলতাব হত্যাকাণ্ডকে সরাসরি সাভারের সামগ্রিক মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তদন্তের চূড়ান্ত তথ্যের অপেক্ষা করা প্রয়োজন।
▪️অভিযানে গ্রেপ্তার, উদ্ধার হচ্ছে মাদক
ঢাকা জেলা ডিবি (উত্তর) পুলিশের তথ্য উদ্ধৃত করে দৈনিক ইনকিলাব জানিয়েছে, গত তিন মাসে সাভারে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী মিলিয়ে ২৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময়ে ১৬৫টি মামলা হয়েছে এবং প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ডিবি (উত্তর) পুলিশের অফিসার ইনচার্জ সাইদুল ইসলাম জানিয়েছেন, মাদক উদ্ধার ও সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এর আগে ২৪ সেপ্টেম্বর উলাইল এলাকায় ১০০ পিস ইয়াবাসহ একজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি-উত্তর) ওই অভিযান চালায় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
এ ছাড়া ৩০ সেপ্টেম্বর সাভারের বেদে পল্লী এলাকায় ১০০ পিস ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিবেদনে এসেছে। সেখানে স্থানীয়দের অভিযোগ হিসেবে একটি মাদকচক্রের কথা বলা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ আইনি অবস্থান স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
▪️মাদক নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ
সাভারে মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বিভিন্ন সময়ে এসেছে।
৪ সেপ্টেম্বর এক অনুষ্ঠানে ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু দলীয় নেতা-কর্মীদের মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের শনাক্ত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানান বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে জুন মাসেও তিনি সাভারে মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে গ্রেপ্তার ও মাদক উদ্ধারের পরিসংখ্যান থাকলেও মাদক সরবরাহের উৎস, বড় চক্র এবং পুনরায় নতুন বিক্রেতা তৈরি হওয়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা কতটা হচ্ছে—এ প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাভারের নাগরিকদের জন্য মাদকবিরোধী অভিযান শুধু খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারীদের গ্রেপ্তারে সীমাবদ্ধ না রেখে মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা ও অর্থের প্রবাহ শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহলের অনেকে।
সাভারে মাদক নিয়ন্ত্রণে চলমান অভিযান ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মাদকের সরবরাহব্যবস্থার মূল উৎস শনাক্তে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন কি না—আপনার মতামত কী???
Leave a Reply