
সাভার-আশুলিয়া ও ঢাকা জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চললেও গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে কেউ কেউ আবার পুরোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন—এমন একটি বাস্তবতার কথা জানিয়েছেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, মাদকবিরোধী কার্যক্রমে শুধু খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে জড়িতদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
৩ অক্টোবর প্রকাশিত ঢাকা পোস্টের এক সাক্ষাৎকারে এসপি শামীমা পারভীন বলেন, আশুলিয়া, আমিনবাজার ও হেমায়েতপুরকে ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারিতে আনা হয়েছে। সাভারসহ অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও পরিকল্পিতভাবে অভিযান চালানোর কথা জানান তিনি।
▪️জামিনের পর ফের অপরাধে জড়ানোর প্রসঙ্গ
ঢাকা পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসপি বলেন, বড় ও মাঝারি পর্যায়ের মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারের পর অনেকেই ১০ থেকে ১৫ দিন কিংবা এক মাসের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জামিনের পর তাঁদের কেউ কেউ আবার আগের কর্মকাণ্ডে ফিরে যান। এ কারণে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় কঠোরতা ও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তবে জামিন আদালতের আইনি সিদ্ধান্ত এবং কোনো আসামি গ্রেপ্তার হলেই তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হয় না। ফলে জামিনে থাকা কোনো ব্যক্তি পুনরায় অপরাধে জড়িত হলে তার পক্ষে প্রমাণ, তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত বিষয়।
▪️বড় কারবারি ও সরবরাহ চেইন নিয়েও প্রশ্ন
এসপি শামীমা পারভীন সাক্ষাৎকারে জানান, আশুলিয়া, আমিনবাজার ও হেমায়েতপুরসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে চিহ্নিত দুই বড় মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের একজন কারাগারে এবং অন্যজন জামিনে রয়েছেন বলে তিনি জানান। একই সাক্ষাৎকারে খুচরা বিক্রেতা বা সেবনকারীদের গ্রেপ্তার হলেও সরবরাহব্যবস্থার নিয়ন্ত্রকেরা অধরা থেকে যাওয়ার বিষয়ে জনগণের ধারণাকে তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে বাণিজ্যিকভাবে মাদক উৎপাদনের পরিবর্তে সীমান্তপথে মাদক প্রবেশের বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে সীমান্ত থেকে দেশের অভ্যন্তর পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থা বন্ধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বাসসকেও দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি মাদক প্রবেশের রুট চিহ্নিত করে বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
▪️সেপ্টেম্বরজুড়ে সাভার-আশুলিয়ায় একাধিক অভিযান
সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে সাভার ও আশুলিয়ায় ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একাধিক মাদকবিরোধী অভিযানের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
১৬ সেপ্টেম্বরের অভিযানে ২৫৮ পিস ইয়াবাসহ নয়জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ করা হয়। ২০ সেপ্টেম্বরের পৃথক অভিযানে ১৩০ পিস ইয়াবাসহ পাঁচজন এবং ২৩ সেপ্টেম্বরের অভিযানে ইয়াবা ও হেরোইনসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ।
এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে আশুলিয়ার দক্ষিণ ভাদাইল এলাকায় একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৫৪৭টি ইয়াবা ও ইয়াবা তৈরির সরঞ্জামসহ একজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশিত হয়। পুলিশ বলেছে, ওই বাড়িতে ইয়াবা তৈরি ও বিক্রির কার্যক্রম চলছিল।
অর্থাৎ, উন্মুক্তভাবে পাওয়া এসব চারটি অভিযানের প্রতিবেদনে ১৬ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অন্তত ২১ জন গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়। এটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান নয়; প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পাওয়া হিসাব মাত্র।
▪️ইয়াবা তৈরির সরঞ্জাম নিয়ে নতুন প্রশ্ন
দক্ষিণ ভাদাইলের ঘটনায় ইয়াবা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের তথ্যটি বিশেষভাবে নজরে এসেছে। কারণ, ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার সাক্ষাৎকারে দেশের অভ্যন্তরে বাণিজ্যিকভাবে মাদক উৎপাদনের বিষয়টি অস্বীকার করে মূলত সীমান্তপথে মাদক প্রবেশের কথা বলেছেন। অন্যদিকে দক্ষিণ ভাদাইলের ঘটনায় পুলিশ স্থানীয় একটি বাড়িতে ইয়াবা তৈরি ও বিক্রির অভিযোগে অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে।
দুটি বক্তব্যের মধ্যে সরাসরি বিরোধ রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে ওই ঘটনায় উদ্ধার করা সরঞ্জাম কী ধরনের, সেগুলো দিয়ে কীভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হতো এবং মাদকের উৎস ও সরবরাহকারী কারা—এসব বিষয়ে তদন্তের ফল জানা প্রয়োজন। তাই এ ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ করা হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে।
▪️পাঁচ মাসের আইনশৃঙ্খলা মূল্যায়ন নিয়েও আলোচনা
ঢাকা পোস্টকে এসপি শামীমা পারভীন বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় পাঁচ মাসে ঢাকা জেলায় বড় কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, দখলদারি বা জমি দখলের মতো বড় চাঞ্চল্যকর অপরাধ ঘটেনি।
তবে এর আগের দিন, ২ অক্টোবর, আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকায় শ্রমিক দলের কয়েকজন নেতার ওপর হামলার খবর প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে একজনকে গুলি এবং আরও কয়েকজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আহত করার কথা বলা হয়েছে। হামলার কারণ হিসেবে বিভিন্ন তথ্য উঠে এলেও ঘটনাটি তদন্তাধীন।
তাই এসপির পাঁচ মাসের সামগ্রিক মূল্যায়নের মধ্যে এ ধরনের স্থানীয় অপরাধের ঘটনাগুলো কীভাবে বিবেচিত হচ্ছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট করা যেতে পারে।
▪️এখন সাভার-আশুলিয়ার মানুষের প্রশ্ন
এসপির বক্তব্য ও সাম্প্রতিক অভিযানগুলো থেকে মাদকবিরোধী তৎপরতা জোরদারের তথ্য পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বোঝার জন্য আরও নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রয়োজন।
বিশেষ করে গত এক বছরে সাভার ও আশুলিয়ায় মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের মধ্যে কতজন জামিন পেয়েছেন, তাঁদের কতজনের বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে পুনরায় অপরাধের অভিযোগ বা মামলা হয়েছে, কতটি মামলায় চার্জশিট হয়েছে এবং কতটি মামলার বিচার শেষ হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ হলে পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।
একই সঙ্গে বিশেষ নজরদারির আওতায় থাকা আশুলিয়া, আমিনবাজার ও হেমায়েতপুরে পুলিশের কার্যক্রমের ফলাফল কীভাবে পরিমাপ করা হচ্ছে, সেটিও জানা প্রয়োজন।
মাদক বিক্রি বা সংশ্লিষ্ট অপরাধ সম্পর্কে তথ্য থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ। তবে যাচাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও নাম বা ছবি ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি। শুধু গ্রেপ্তার বা অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা আইনগতভাবে সঠিক নয়।
Leave a Reply